পর্দার আড়ালে নীরব বিপ্লব: বিএনপিকে শাণিত করছে
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ০৬:১৭ PM

পর্দার আড়ালে নীরব বিপ্লব: বিএনপিকে শাণিত করছে

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫/০৬/২০২৬ ১২:০৪:২৫ PM

পর্দার আড়ালে নীরব বিপ্লব: বিএনপিকে শাণিত করছে


পেশীশক্তি আর সস্তা স্লোগানের চিরাচরিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে যুক্তি ও তথ্য-উপাত্তভিত্তিক আধুনিক রাজনীতির চর্চায় পর্দার আড়ালে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে বিএনপির গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ সেন্টার’ (বিএনআরসি)। তবে প্রতিষ্ঠার এক দশক পেরিয়ে গেলেও তাদের বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, এখনো অন্ধকারে রয়েছেন খোদ বিএনপিরই সিংহভাগ নেতা-কর্মী।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত দিনে আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন-সিআরআইয়ের সঙ্গে বিএনপির এই গবেষণা সংস্থার গুণগত পার্থক্য সম্পর্কে জনগণকে অবগত করার পাশাপাশি সংগঠনের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে উপস্থাপন এখন সময়ের দাবি।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দূরদর্শী নির্দেশনায় ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে বিএনআরসি।

পরে ওই বছরের ৩০ মার্চ দলীয় প্রধানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার একদিন পরই ১ এপ্রিল কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। ২০১৭ সালে বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’-এর তথ্য-উপাত্ত এবং ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরিতে এই টিম প্রথম বড় পরিসরে কাজ শুরু করে।

অতি সম্প্রতি (এপ্রিল ২০২৬) এই গবেষণা সেল এবং ‘বিএনপি গ্রাসরুটস নেটওয়ার্ক’-এর যৌথ তত্ত্বাবধানে সরকারের আটটি ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচির (যেমন: ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ইত্যাদি) অগ্রগতি ও অর্জন নিয়ে তৈরি করা বিশেষ বুকলেটটি দলের প্রধানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বিএনআরসির কার্যক্রম সরাসরি পরিচালিত হয় দলের শীর্ষ নেতৃত্বের তত্ত্বাবধানে। সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের সঙ্গে ডেটা অ্যানালাইসিসের জন্য এই সেন্টারে যুক্ত রয়েছেন দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ এবং একঝাঁক তরুণ গবেষক (রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটস)। মাঠপর্যায়ের রাজনীতির পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতির মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই উইংটির জন্ম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দলের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত, ইশতেহার এবং জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি প্রণয়নে বিএনআরসি কীভাবে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, তা বাংলানিউজকে বলেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

প্রশিক্ষণ সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমাদের এই সংগঠন গবেষণা করে। পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ নানা বিষয়ে এখানে আলোচনা হয়, পরামর্শ নেওয়া হয়। আমাদের ৩১ দফা নিয়ে এই বিএনআরসিতে আলোচনা হয়েছে। জুলাই সনদের বিষয়ে আমাদের অবস্থান এবং করণীয় নির্ধারণেও আমরা বিএনআরিসর মতামত নিয়েছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের একটাই স্বীকৃত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে, সেটা হচ্ছে বিএনআরসি। এর বাইরে ব্যক্তিগতভাবে বিএনপির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে কেউ সংগঠন চালাতে পারে, কিন্তু সেটি বিএনপির দলীয় কোনো গবেষণা সংস্থা নয়।

বিএনপির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল বলেন , মূলত বিএনআরসির মাধ্যমেই বিএনপির গবেষণা কাজ পরিচালিত হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করে আমরা বের করি প্রকৃতপক্ষে আমাদের পার্টির পলিসিটা কী হবে, আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো কখন কীভাবে গ্রহণ করা উচিত। এটি আমাদের ইশতেহার প্রণয়নেও বড় ভূমিকা রেখেছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেভাবে দেশটাকে দেখতে চেয়েছিলেন, সেই লক্ষ্যে কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হয় এখানে। এখানে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সফল বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেন এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।

আজিজুল বারী হেলাল আরও যোগ করেন, বিএনআরসি ছাড়াও দলের কিছু সাব-রিসার্চ সেল কাজ করছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-পুরোহিতদের ভাতা প্রদান করাসহ ইতিমধ্যে যেসব জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট গবেষণা সেলের মাধ্যমে এসেছে। কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের পর তার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা দূর করা এবং সেটিকে আরও সময়োপযোগী করতে এই সেলগুলো সবসময় কাজ করে যাচ্ছে।

বিএনপির এই রূপান্তরকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়ের দাবি বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষকেরা।

বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মারুফ কামাল খান বলেন, বিএনপি বরাবরই মেধা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেয়। অতীতে এ ধরনের কাজের জন্য তারা বাইরের নামকরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিয়ে জরিপ করিয়েছে। তবে একেবারে দলীয়ভাবে নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জায়গায় বিএনপির কিছুটা ঘাটতি ছিল, দেরিতে হলেও বিএনপি এটা শুরু করেছে—এটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে হলে গবেষণা সংস্থা ও হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত থাকতেই হবে। অন্যথায় সঠিক রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। উন্নত দেশের মতো আমাদের রাজনীতিকেও এখন মেধা, মণীষা, যুক্তি ও তথ্যের ওপর দাঁড় করাতে হবে।

বিএনআরসির মতো সংগঠন প্রতিটি রাজনৈতিক দলের থাকা দরকার উল্লেখ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জবান সম্পাদক রেজাউল করিম রনি বলেন, বিএনপির রাজনীতি যেহেতু কতগুলো প্র্যাকটিক্যাল কার্যক্রম ঘিরে আবর্তিত হয়, সেই কার্যক্রমগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থাকা অনেকদিন থেকেই প্রয়োজন ছিল। এখানে যারা শুরু থেকেই কাজ করছেন, তাদের মধ্যে এক ধরনের একাডেমিক আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। সবচেয়ে ভালো দিক হলো, এখানে বিএনপির দলীয় লোকজনের বাইরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের যুক্ত করা হয়েছে এবং তাদের প্রকল্পভিত্তিক কাজে লাগানো হয়েছে। আমি নিজেও এর কয়েকটি কাজের সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলাম।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী সরকারের ফ্যাসিবাদী আমলে সীমাহীন জুলুম-নির্যাতনের কারণে দল হিসেবে বিএনপি মাঠে-ময়দানে সবসময় আশানুরূপভাবে কার্যক্রম চালাতে না পারলেও বিএনআরসি পর্দার আড়ালে থেকে নিয়মিত তাদের কাজ চালিয়ে গেছে। বাংলাদেশের ইতিহাস, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ৭ নভেম্বরের মতো ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু মৌলিক কাজ করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি।

অনেকে বিএনপির এই উইংটিকে আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন’র (সিআরআই) সঙ্গে তুলনা করতে চাইলেও বিশ্লেষকরা এর মাঝে বড় ধরনের গুণগত ফারাক দেখছেন। জনগণের সামনে এই পার্থক্যের চিত্র স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

রেজাউল করিম রনি এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট করে বলেন, আওয়ামী লীগের সিআরআই ছিল মূলত একটা প্রোপাগান্ডা সেল, যার সঙ্গে শত্রুরাষ্ট্রের অনেক সংযোগ ছিল। আর বিএনআরসি হচ্ছে একটি খাঁটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান; এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। সিআরআইয়ের বিশাল প্রকাশনী, জাঁকালো ম্যাগাজিন ও বিশাল পেইড ‘ইয়াং টিম’ ছিল। অন্যদিকে, বিএনআরসির কোনো ফিক্সড বেতনভুক্ত টিম বা কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই, সেরকম বিশাল বাজেটও নেই। এখানে যারা কাজ করেন, তারা মূলত দলের প্রতি ভালোবাসা থেকে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতেই অবদান রাখছেন।

বিএনআরসির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের প্রচারবিমুখতা। প্রতিষ্ঠানটি এত দিনে জাতীয় স্বার্থে ও দলীয় পলিসি মেকিংয়ে যেসব যুগান্তকারী কাজ করেছে, সে সম্পর্কে দেশের জনগণ তো দূরের কথা, খোদ বিএনপির তৃণমূল বা মাঝারি সারির নেতা-কর্মীরাই জানেন না। সরেজমিনে বেশ কিছু নেতাকর্মীর সাথে কথা বলে পাওয়া গেছে এমন তথ্য।

এ প্রসঙ্গে রেজাউল করিম রনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, বিএনআরসিকে দ্রুত একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি। দেশি-বিদেশি কোনো গবেষক যদি বিএনপি বা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে স্টাডি করতে চান, তবে বিএনআরসি যেন হতে পারে তার প্রধান ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার।

শুধুমাত্র ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরিতে বিএনআরসি যে নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে, তার বার্তা সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। পেশিশক্তিকে পেছনে ফেলে মেধাভিত্তিক রাজনীতির এই ধারাকে টেকসই করতে বিএনআরসিকে আরও দৃশ্যমান ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর