মৌলভীবাজারে সম্প্রতিক বন্যায় কৃষি, মৎস্য এবং সড়ক ও জনপদ মিলিয়ে প্রায় ৮০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে। বাঁধ পুনর্নির্মাণ, কৃষিখাতের ক্ষতি দূরীকরণ, মৎস্য সম্পদ সমৃদ্ধিকরণ ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের খরস্রোতা মনু ও ধলাই নদীর পাঁচটি স্থানে ব্যাপকভাবে ভাঙন দেখা দেয়। এ ভাঙনে জেলার রাজনগর, কুলাউড়া, কমলগঞ্জসহ পাঁচ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়ে।
এতে আউশ ফসল, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং গ্রামীণ অভ্যন্তরীণ কাঁচাপাকা সড়ক যোগাযোগ ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়।
জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা রাজনগর, কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সদর।
এবারের এ স্বল্পকালীন বন্যায় পাঁচটি উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ৪ হাজার মানুষ তাদের বসতবাড়ি হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
জমিতে লাগানো আউশ, আমনের বীজতলা এবং গ্রীষ্মকালীন ৪০০ হেক্টর ফসলের ক্ষতি হয়েছে। টাকার হিসেবে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি টাকা। এ উপজেলাগুলোর ৯০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক পথ ও ৫টি কালভার্ট ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সড়কপথের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি রাজনগর, কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলা। টাকার হিসেবে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সেই সঙ্গে রাজনগর উপজেলায় ২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে।
মৎস্যখাতে ৪০৫টি পুকুরের মাছ ও পোনা মাছ ভেসে গেছে। মৎস্যখাতে ১ কোটি ১৬ লাখ টাকার ক্ষতি ধরা হয়। এ ছাড়া মনু ও ধলাই নদীর পাঁচটি স্থানে ভাঙন ও নদী দুটির বাঁধে একাধিক স্থানে ফাটলের সৃষ্টি হয়। এতে টাকার হিসাবে আরও ১ কোটি টাকার ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়। সবমিলিয়ে এ বছরের প্রথম দফা বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটির টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সরকারের কাছে পুনর্বাসনের দাবি করছেন।
রাজনগর ও কমলগঞ্জসহ আরও কয়েকটি উপজেলা সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, বন্যায় কৃষিখাতে বিপুল পরিমাণ লোকসান হয়েছে। রাজনগর উপজেলার মনু নদীর ভাঙন এলাকার উজিরপুরের বয়োবৃদ্ধ আব্দুল হান্নান জানান, এ বন্যায় নদী পাড়ের তার ঘরের ক্ষতিসহ গৃহপালিত বেশকিছু হাঁস-মুরগি হারিয়েছেন। তিনি এমনিতেই একজন অসহায় বৃদ্ধ লোক। পরিবারের আয় রোজগারের কোনো পথ নেই।
একই গ্রামের জয়নাল মাস্টার জানান, তার ঘর থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে মনু বাঁধ। অথচ পানির চাপে তার ঘরের পাশে ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। এতে তার ঘর-গেরস্থির ব্যাপক ক্ষতি হয়।
তিনি আরও জানান, এখন নতুন আতঙ্ক নদীর ভাঙা বাঁধ। নদীতে পানি বাড়লে আবারও বন্যা হবে।
কথা হয় কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ধলাই নদীর ভাঙনের শিকার মকাবিলের রমজান আলী, সালাউদ্দিনসহ অনেকের সঙ্গে। সবার একই কথা। মকাবিল মসজিদের পাশের ভাঙনে কৃষি নির্ভরশীল আদমপুর ইউনিয়নের গ্রামগুলো পুরোটা তছনছ হয়ে গেছে। মুসলিম মনিপুরী পাঙ্গন সম্প্রদায়ের লোকেরা এমনিতেই পিছিয়ে পড়া এক জাতি। তারপর বন্যা তাদের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
স্থানীয়রা জানান, মকাবিলের মনু ভাঙন এলাকার প্রতিরক্ষা বাঁধ মেরামত করতে চাইলে প্রতিবারই ভারতের সীমান্ত রক্ষী বিএসএফ বাধা দিচ্ছে। এতে বিশাল আকৃতির মনুর ভাঙন মেরামত করা যাচ্ছে না। বাঁশের ওপর কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকা মকাবিল গ্রামের রমজান আলী তার ঘরটি দেখিয়ে জানালেন, তিনি একদম অসহায়। যে কোনো সময় তার ঘরটি পড়ে যাবে। ঘর মেরামতে তার কোনো সামর্থ্য নেই।
এদিকে আদমপুর বাজার থেকে ভান্ডারিগাঁও পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫ কিলোমিটার সড়ক বন্যায় একেবার ক্ষতিগ্রস্ত করে দিয়ে গেছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক কালভার্ট ও সেতু ভেঙে গেছে। এ অঞ্চলের কাঁচা সড়কের আরও বেহাল দশা। একইভাবে রাজনগর, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার সড়ক পথের বেহাল অবস্থা।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় জানান, তার এলাকাটি মূলত কৃষিপ্রধান এলাকা। এ অঞ্চলের অন্যতম ফসল গ্রীষ্মকালীন টমেটো। তিনি জানান, টমেটোসহ আউশ এবং আমনের বীজতলার ব্যাপক ক্ষতির কথা। তার হিসেবে এ উপজেলায় ২ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। আর প্রায় ২০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এলজিইডির প্রকৌশলী মো. সাইফুল আজম জানান, কমলগঞ্জে ৫০ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতির পরিমাণ টাকার হিসাবে প্রায় ১০ লাখ টাকা।
রাজনগর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাজু চন্দ্র পাল জানান, তার উপজেলায় সড়ক পথের প্রায় ৩৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া কুলাউড়া উপজেলায় সড়ক পথের প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তের বিষয়ে জানান, সাম্প্রতিক বন্যার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপনের কাজ হচ্ছে। এটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত হলে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। পরে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আজকের সিলেট/এপি









