বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তারেক রহমান
শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৬ AM

বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তারেক রহমান

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪/০৭/২০২৬ ০৯:৫৬:১৮ AM

বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তারেক রহমান


অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে আইডল হয়ে উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একসময় দেশের তরুণদের সামনে তেমন কোনো আইডল না থাকায় তারা স্টিভ জবস, জ্যাক মা বা মার্ক জাকারবার্গকে আইডল মনে করে নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন দেখতেন। তবে গত এক দেড় দশকে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৃজনশীলতা দিয়ে আদর্শ হয়ে উঠতে চেষ্টা করেন।

তবে সৃজনশীলতার সঙ্গে সততা, কর্মনিষ্ঠা ও একাগ্রতার মিশেলে যে জায়গায় পৌঁছালে মানুষের কাছে আদর্শ হয়ে ওঠে, অনুকরণীয় হয়ে ওঠে, সেই তৃষ্ণা মেটেনি কখনোই। একারণে দেশের স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা যেন খুব একটা এগোতেও পারছিলেন না। বিজয় কি-বোর্ড আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে অনেকের সামনে আসেন মোস্তাফা জব্বার।

মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিলেন সোলায়মান সুখন। যোগাযোগ প্রযুক্তি আর উপস্থাপনা শৈলী দিয়ে রাতারাতি তারকা খ্যাতি পাওয়া আয়মান সাদিক হয়ে ওঠেন স্টার্টআপ জগতের পাইওনিয়র। তবে কেউই যেন সেইভাবে মোহাবিষ্ট করতে পারছিলে না।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গত দেড় বছরে এই সংকট আরও তীব্র হয়। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর উদ্যোক্তারা যেনো হালে পানি পেয়েছেন।

প্রথম কিছু দিন দপ্তর বণ্টনসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোই করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এর ফাঁকে ফাঁকে তিনি দেশের মানুষদের নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখাতে শুরু করেছেন। এজন্য তাকে আলাদা কিছু করতে হয়নি, তিনি কেবল একটু ভিন্নভাবে কাজগুলো করে গেছেন।

ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ফুয়েল কার্ড—এভাবে বেশ কিছু কার্ডের প্রচলন দেশের ডিজিটাল আইডেন্টিটি ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত একটি মডেলে নিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছে।

তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী হয়েও যখন তিনি প্রোটকল ছাড়াই রাস্তায় বের হন, বৃষ্টিতে নিজেই গাড়ি চালিয়ে সহধর্মীনীকে নিয়ে তার ঘুরে বেড়ানো, মেয়েকে নিয়ে সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যাওয়া, রাষ্ট্রীয় কাজে স্বল্প দূরত্ব হেঁটে যেতে শুরু করেন, তখন থেকেই দেশের মানুষের কাছে নতুন একটি বার্তা পৌঁছে যায়। আদর্শ রাজনীতিবিদের পাশাপাশি তিনি হয়ে উঠতে শুরু করেন আদর্শ স্বামী, আদর্শ বাবা।

সর্বোপরি তার বক্তব্য ও কার্যক্রমের মধ্যেও এখন খুঁজে পাওয়া যায় মোটিভেশন। গত ৯ মে ওয়াকিমুল ইসলাম নামের এক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণের বানানো স্মার্ট কারে চড়ে তাকে উৎসাহ দেন তারেক রহমান। দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাটারিচালিত এই বাহন তৈরি করায় ১৭ বছরের তরুণের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি কম খরচে আরও আধুনিক ও সহজে ব্যবহারযোগ্য স্মার্ট কার তৈরির পরামর্শও দেন।

এই ঘটনা টিভিতে দেখে বা সোশ্যাল নেটওয়ার্কের রিল আকারে দেখেছে কোটি মানুষ, যা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণদের কাছে এক বিরল ঘটনা, অনুপ্রেরণার অনন্য উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

তারেক রহমান স্কুল শিক্ষার্থীদের সায়েন্স প্রজেক্ট ঘুরে দেখছেন। বড়দের উদ্যোক্তা মেলায় যাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে ছবি তুলছেন, সেলফি তুলছেন, ভিডিও করছেন। কখনো কখনো সেসব ভিডিও তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে রিল আকারে ছাড়ছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই উদারতাই দেশের মানুষকে আলোকিত করছে, স্বপ্ন দেখাচ্ছে। দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থানকালে সেখানাকার পরিচ্ছন্ন জীবনের অভ্যাস তাকে দেশের মানুষের কাছে নতুন করে চিনিয়েছে।

তিনি একটা ময়লা টিস্যুও রাস্তা বা যেখানে সেখানে ফেলেন না। দরকার হলে সেটা পকেটেই রেখে দেন। অবশ্য এই অভ্যাসটি তিনি ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুলেছেন বলে সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেছেন।

দেশবাসীকে যত্রতত্র ময়লা না ফেলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাইরে থেকে কেউ এসে আমাদের দেশকে পরিষ্কার করে দিয়ে যাবে না। দেশটাকে সুন্দর করতে হলে সকলে মিলেই চেষ্টা করতে হবে।’ গত ২০ জুলাই বরিশালের গৌরনদীর সরিকল-বাটজোর খালপাড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর এই ছোট্ট আচরণই যেন তার নেতৃত্বের একটি ভিন্ন দর্শন তুলে ধরেছে।

পানিতে ভাসমান দুটি প্লাস্টিকের বোতল দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বাড়িতে পাঁচজনের মধ্যে একজন পরিষ্কার করলে আর বাকিরা ময়লা করলে সে বাড়ি যেমন পরিচ্ছন্ন থাকে না, দেশটাও তেমনি। আমাদের সবাইকে মিলেই দেশকে পরিষ্কার রাখতে হবে।’

তার এই সাধারণ কিন্তু সুগভীর বোধ প্রমাণ করে, তিনি কেবল রাষ্ট্রের কাঠামোগত উন্নয়নেই নয়, নাগরিকদের মনন, দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা গড়ে তোলার দিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বিগত দেড় দশকের বেশি সময় নির্বাসন, শারীরিক যন্ত্রণা, ষড়যন্ত্রের পাহাড় আর ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বাংলাদেশকে যে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন, তা সমকালীন বিশ্বরাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

নরসিংদীতে একটি কুকুরের গলায় ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া এবং লালমনিরহাটে ছাগলের ওজন কৃত্রিমভাবে বাড়াতে নল দিয়ে জোর করে পানি খাওয়ানোর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সাম্প্রতিক এ দুটি ঘটনা তার নজরে এলে তিনি দ্রুত জড়িতদের শনাক্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘মানুষের মধ্যে যদি মনুষ্যত্ব হারিয়ে যায়, তাহলে মানুষ আর পশুর মধ্যে তফাৎ কী?’

তিনি জানান, পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান হবে ‘জিরো টলারেন্স’। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

সরকারি কাজের অর্থের অপব্যবহার নিয়েও তিনি সোচ্চার রয়েছেন। চট্টগ্রাম থেকে হাটহাজারী-ডুলাহাজারা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে বিপুলসংখ্যক গাছ কাটা হলেও ঘোষিত সংখ্যক গাছ রোপণ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারি হিসাবে সাত লাখ গাছ লাগানোর কথা বলা হলেও নিজে যাচাই করে সেখানে বড়জোর দুই লাখের মতো গাছ দেখেছেন। বিষয়টিকে তিনি ‘খুবই দুঃখজনক’ বলে উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী জানান, উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখছে সরকার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি নতুন গাছ রোপণের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন, জলবায়ু সহনশীল টেকসই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।’

এ লক্ষ্যে ‘ক্লাইমেট ইয়ুথ ফেলোশিপ’ ও ‘এনভায়রনমেন্ট স্টার্টআপ ফান্ড’সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পরিকল্পনাহীন বৃক্ষরোপণের পরিবর্তে পরিবেশ, মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগী দেশীয় প্রজাতির বনজ, ফলদ, ওষুধি, বাঁশ ও বিপন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো প্রয়োজন। নব্বইয়ের দশকে লাগানো ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির মতো গাছ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আইসিটি মন্ত্রণালয় থেকে ৫০০ কোটি টাকার বাজেট রাখা হয়েছে। ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত একজন স্টার্টআপ উদ্যোক্তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব। নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের প্রজেক্ট দেখে ফান্ড করা হবে। প্রথমবার স্টার্টআপ ব্যর্থ হলেও সম্ভাবনা থাকলে দ্বিতীবার অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি নিজেও ব্যবসা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সবসময় আমার রাজনৈতিক জীবনটা মুখ্য হয়ে উঠেছে। এজন্য আমাকে অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে, শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে। এই যন্ত্রনার মধ্যে দিয়ে আজকে আমি প্রধানমন্ত্রী হয়েছি।’

তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আপনারা যা করতে চাইছেন, সেটি সহজ নয়। কিন্তু যদি ইচ্ছা থাকে, তাহলে অবশ্যই পারবেন।’

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন ছিল শহরকেন্দ্রিক ও বৈদেশিক ঋণনির্ভর। তারেক রহমান এই মডেল বদলে দিয়েছেন। তার লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা। আর এই যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐতিহ্যের পথ ধরে তিনি শুরু করেছেন ‘দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি ২০২৬’।

সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বকেয়া থাকা সমস্ত কৃষি ঋণ সুদসহ সম্পূর্ণ মওকুফ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সারা দেশের প্রায় ১৩ লাখ প্রান্তিক কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন।

আইটি খাতকে রপ্তানির দ্বিতীয় স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তিনি যে ‘স্টার্ট-আপ ফান্ড’ ও ফ্রিল্যান্সিং সুবিধা চালু করেছেন, তা দেশের বেকার তরুণদের নতুন দিগন্ত দেখাচ্ছে।

নির্বাসন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায়
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। জরুরি অবস্থা জারির পর ‘মাইনাস ফর্মুলা’র প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন তারেক রহমান। রিমান্ডের নামে নির্মম শারীরিক নির্যাতন আর শত শত মিথ্যা মামলার বোঝা কাঁধে নিয়ে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান তিনি। দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিনের সেই প্রবাস জীবন ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা।

২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর। পূর্বাচলের ‘৩৬ জুলাই এক্সপ্রেস’ চত্বরে লাখো জনতার জয়ধ্বনির মধ্যে তারেক রহমান দেশের মাটিতে পা রাখলেন। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিন পর, ৩০ ডিসেম্বর তাকে হারাতে হয় তার প্রিয়তম মা, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আলোকবর্তিকা বেগম খালেদা জিয়াকে।

মায়ের বিদায়ে গোটা জাতি যখন শোকাভিভূত, তখন শোককে শক্তিতে পরিণত করে অনন্য ধৈর্য ও নেতৃত্বের প্রমাণ দেন তিনি। গত ৯ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে তিনি বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন। বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান আর ৩১ দফার আধুনিক ইশতেহার জনগণের হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিল। ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২১২টিতে নিরঙ্কুশ জয়লাভ কেবল একটি বিজয় ছিল না, এটি ছিল বিগত দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের ব্যালট বিপ্লব। ঢাকা ও বগুড়ার দুটি আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

বিজয়ের পর তিনি দেশে কোনো আনন্দ মিছিল করতে দেননি। উল্টো ঘোষণা দেন, ‘বিরোধ যেন প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়।’ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে তিনি যে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করেছেন, তা বাংলাদেশে আগে কখনো দেখা যায়নি। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান কিংবা ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলামের সঙ্গে তার সংলাপ ও সহাবস্থান দেশের মেরুকরণের রাজনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় নীরব বিপ্লবটি তারেক রহমান ঘটিয়েছেন ব্যক্তিবন্দনার অবসান ঘটিয়ে। সরকারি অফিসে প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙানোর বাধ্যবাধকতা তিনি তুলে দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, ছবি নয় কাজই নেতার আসল পরিচয়। শনিবার ছুটির দিনেও তিনি নিয়মিত অফিস করছেন। তার এই কর্মস্পৃহা পুরো সচিবালয়ে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করেছে। তিনি নিজে নিজের গাড়ির জ্বালানি খরচ মেটান এবং বেতন থেকে ১০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেন, এমন নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কেউ স্থাপন করেননি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর গোলাম হাফিজ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেবল জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি নন, তিনি আজ নিজের যোগ্যতায় বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রতীক। তার প্রতিটি বক্তব্য, সিদ্ধান্ত এবং কর্মে ফুটে উঠছে এক আধুনিক, গণতান্ত্রিক এবং আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের ছবি। ইতিহাস তাকে এক ‘মেরিন হিউম্যান’ বা সমুদ্রের মতো বিশাল হৃদয়ের নেতা হিসেবেই মনে রাখবে, যিনি শান্ত সমুদ্রে নয়, বরং উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে নৌকাকে তীরে ভিড়িয়েছেন।

যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক বলেছেন, দীর্ঘ নির্বাসন, শারীরিক যন্ত্রণা, ষড়যন্ত্রের পাহাড় আর ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বাংলাদেশকে যে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন, তা সমকালীন বিশ্বরাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বপ্ন শুধু দেখাচ্ছেন না, তা বাস্তবায়ন করে এগিয়ে নিচ্ছেন দেশকে।

তাকে নিয়ে ছিল ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী দল বিএনপির যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমান যাতে দলের হাল না ধরতে পারেন, সেই হীন উদ্দেশ্য নিয়ে তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা শুরু হয়। আওয়ামী লীগের নিজস্ব প্রচারযন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে তার নামে দুর্নীতির কলঙ্ক লেপন করা হয়। বিদেশে বসে তারেক রহমান যাতে দলকে সংগঠিত করতে না পারেন, সেজন্য আদালতের মাধ্যমে দেশের মিডিয়াতে তার বক্তব্য ও ছবি প্রচার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়। তারেক রহমানের ইমেজ নষ্ট করতে তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়।

এক পর্যায়ে তার দেশে ফিরে আসা নিয়ে অনেকটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তাকে দেশে ফিরে আসতে প্রায় ১ বছর চার মাস অপেক্ষা করতে হয়।

স্বপ্নের বাংলাদেশ হোঁচট খায় বার বার
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে যুবসমাজ নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল। অনেকে সরকারি চাকরির সুযোগ ছেড়ে রাজনীতি, ব্যবসা কিংবা দেশ গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির প্রত্যাশায় সবাই নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু অচিরেই সেই স্বপ্নে ছেদ পড়ে।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশাসনিক দুর্নীতি, লুটপাট, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনিয়ম, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মানুষের জীবনকে চরম দুর্ভোগে ফেলে। একই সময়ে রক্ষীবাহিনীকে দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক বহুমতের পরিসর আরও সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে স্বাধীনতার উচ্ছ্বাসের জায়গা দখল করে নেয় হতাশা, অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার অনুভূতি।

তবে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশবাসীর মনে নতুন করে স্বপ্নের বীজ বপন করতে সক্ষম হন। তিনি খাল খনন কর্মসূচি নিয়ে ছুটে বেড়াতেন গ্রাম থেকে গ্রামে। কৃষক-মজুরদের সঙ্গে হাত মেলাতেন। তার আহ্বানে সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই কর্মসূচিতে অংশ নিত। দেশকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার সেই উদ্যোগ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল।

কিন্তু ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হলে সেই স্বপ্নেরও আকস্মিক অবসান ঘটে। এরপর স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে দেশ আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। তখন মানুষের একটাই স্বপ্ন ছিল, কীভাবে এই স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানো যায়। এরশাদ সরকারের প্রতি জনঅসন্তোষ ক্রমেই তীব্র হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে।

১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ আন্দোলনের পর দেশবাসী, বিশেষ করে তরুণ সমাজ, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও উন্নয়নমুখী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংঘাত, হরতাল-অবরোধ, পারস্পরিক অবিশ্বাস, দুর্নীতি ও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে সেই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা প্রত্যাশিত পূর্ণতা পায়নি। এরপর ২০০৭ সালের এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং তার ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সেই দীর্ঘ অচলাবস্থার বিরুদ্ধে নতুন আশার জন্ম দেয়। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশ (বাংলাদেশ ২.০) নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মব সহিংসতা, নারী নির্যাতন এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা ঘিরে নানা সমালোচনার কারণে সেই প্রত্যাশাও ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকে।

এমন বাস্তবতায় বিপুল জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আবারও মানুষের সামনে নতুন আশার দুয়ার খুলে দেন। তার বিভিন্ন উদ্যোগ, বক্তব্য ও রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন দেশের মানুষের, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নির্মাণের নতুন বিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে শুরু করে।

স্বপ্নপূরণে তারেক রহমানের চ্যালেঞ্জ
তবে স্বপ্ন দেখানো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ ততটাই কঠিন। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন একের পর এক কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের সংস্কৃতি বন্ধ করা, প্রশাসনে জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি—এসবই হবে তার সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, তরুণদের জন্য উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির সুযোগ বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলাও সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও পথটি খুব সহজ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত ও চীনের মতো দুই আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড ও নিরাপত্তা ইস্যু মোকাবিলা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা; এসব ক্ষেত্রেও দক্ষ নেতৃত্বের প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের আস্থা ধরে রাখাও হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাস মনে রাখে না কে কত বড় স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন; ইতিহাস মনে রাখে, কে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবারও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে, এখন সেই স্বপ্নকে বাস্তব অর্জনে রূপ দেওয়াই হবে তার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর