গ্যাস সংকটে স্থবির হবিগঞ্জ শিল্পাঞ্চল, ছাঁটাই আতঙ্কে দেড়লাখ শ্রমিক
শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৩৭ PM

গ্যাস সংকটে স্থবির হবিগঞ্জ শিল্পাঞ্চল, ছাঁটাই আতঙ্কে দেড়লাখ শ্রমিক

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৫/০৮/২০২৬ ১০:৫৯:৫৭ AM

গ্যাস সংকটে স্থবির হবিগঞ্জ শিল্পাঞ্চল, ছাঁটাই আতঙ্কে দেড়লাখ শ্রমিক


হবিগঞ্জে শিল্প এলাকায় তৃতীয় দিনের মতো গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে বন্ধ আছে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন। প্রায় সবগুলো কারখানাতেই অলস সময় কাটাচ্ছেন শ্রমিকরা। অনেক কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ছাঁটাই আতঙ্ক। উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানার খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন শিল্প মালিকরা। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে হাজার কোটি টাকা।

স্কয়ার ডেনিম লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাজেদ হোসেন জানান, এখনো পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা হয়নি। একেবারে শূন্য। মেশিন, বিদ্যুৎ সবকিছু বন্ধ। বেশি সময় বন্ধ থাকলে মেশিনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তিনি বলেন, একটি লাইনে দৈনিক তাদের গ্যাসের চাহিদা এক লাখ দুই হাজার ৫৯৭ কিউবিক মিটার এবং অপর লাইনে চাহিদা ৮৬ হাজার ২৮ কিউবিক মিটার। কিন্তু তিনদিন হতে চলেছে কোনো গ্যাস নেই।

এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার বলেন, ‘প্রতিমাসে আমাদের ১০ লাখ ৩৫ হাজার ঘনমিটার গ্যাস প্রয়োজন। সে হিসেবে দৈনিক প্রয়োজন ৩৪ হাজার ৫০০ ঘনমিটার। আজ সকালে ৬০ শতাংশ গ্যাস দিয়েছে। কিন্তু দুপুর ১২টায় হঠাৎ সরবরাহ ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এ অবস্থায় মেশিন চালানো অত্যন্ত কঠিন। বারবার বিদ্যুৎ যাওয়া আসা করলে মেশিনও বিকল হয়ে যেতে পারে। এসব মেশিন অত্যাধুনিক। এগুলো নষ্ট হলে মেরামত করাও কঠিন।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। আমরা যারা শিল্পে কাজ করি, তারাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। মালিকপক্ষ কতদিন লোকসান গুনবে? এভাবে চলতে থাকলে একসময় মানুষ চাকরি হারাবে।’

এরইমধ্যে ১৩ শতাংশ রপ্তানি কমে গেছে বলে জানান এসএম স্পিনিংয়ের এই মহাব্যবস্থাপক। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন কোম্পানির অর্ডার বাতিল হচ্ছে। আসলে দেড়লাখ শ্রমিকতো শুধু দেড়লাখ নয়, এরসঙ্গে আরও অনেকে জড়িত। যদি প্রত্যেকের সঙ্গে পাঁচজন করে ধরি, তবে সাড়ে সাত লাখ মানুষের ভাগ্য শিল্পের সঙ্গে জড়িত। সুতার সঙ্গে কাপড়ের সম্পর্ক। কাপড় যারা তৈরি করেন তারা রপ্তানি না করতে পারলে সুতা নেবেন না।’

সায়হাম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক জানান, শুক্রবার তারা একেবারেই গ্যাস পাননি। তবে কোনো শ্রমিককে ছুটি দেওয়া হয়নি। গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে যেন মেশিন চালু করতে পারেন, সেই আশায় আছেন।

তিনি বলেন, ‘গ্যাস না থাকা বা বারবার আসা যাওয়ার কারণে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিছু যন্ত্র আছে যেগুলো আসলে মেরামতযোগ্য নয়। এগুলো নতুন এনে লাগাতে হয়।’

একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফরাস দেবনাথ জানান, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঠিকমতো উৎপাদন করা যাচ্ছিল না। এখন পুরোপুরি গ্যাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানায় কাজও বন্ধ রয়েছে। কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মস্থলে এসে অলস সময় পার করছেন। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে পড়বে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানান তিনি।

শুধু শিল্পমালিক বা কর্মকর্তারা নয়, গ্যাস সংকটে উদ্বিগ্ন শ্রমিকরাও। শেফালী বেগম নামের একজন শ্রমিক জানান, গ্যাস সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা খুবই দুশ্চিন্তায় আছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন কাজ করে সংসার চালাই। কারখানা বন্ধ থাকলে আমাদের কাজ নেই, আয়ও নেই। কতদিন এভাবে চলবে, সেটিও জানি না। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আমাদের মতো শ্রমিকদের পরিবার সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে।’

সিলেট জোন শিল্প পুলিশের ওসি হিল্লুল রায় জানান, হবিগঞ্জ জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পকারখানা রয়েছে। এগুলোর নিরাপত্তা বিধানে তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরীর বলেন, সারাদেশের যা অবস্থা আমাদেরও একই অবস্থা। কোনো উন্নতি নেই, আগের মতোই আছে। গতরাতে (বৃহস্পতিবার) কিছুটা পেয়েছিলাম। কিন্তু কিছু সময় পরই আবার আগের মতো বন্ধ হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা শুনেছিলাম ১৫ আগস্ট থেকে ঠিক হবে। কিন্তু অফিসিয়ালি আমাদের কিছু জানানো হয়নি। আমরা শুধু বিতরণ করি। গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ করে সব পেট্রোবাংলা।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই হবিগঞ্জ জেলায় শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ২০ দিন ধরে সংকট থাকলেও সরবরাহ ছিল সামান্য। কিন্তু বুধবার (১২ আগস্ট) থেকে পুরোপুরিই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে জেলার ১৭১টি শিল্পকারখানার প্রায় সবগুলোতেই। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক।

কারখানা বন্ধ থাকায় প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে শত শত কোটি টাকা, যার বেশিরভাগই রপ্তানি আয়। একের পর এক বাতিল হচ্ছে বৈদেশিক অর্ডার। দৈনিক খরচ চালানো নিয়ে এখন অনেক কারখানা হিমশিম খাচ্ছে। তবে গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ ঠিক হয়ে যাবে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর