সরকার নির্ধারিত নতুন দামে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির কথা থাকলেও সুনামগঞ্জের বাজারে তার সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার এখনো এক হাজার ৬৫০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকা কিংবা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
রোববার সুনামগঞ্জ শহর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। অথচ গত বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সিদ্ধান্তে এলপিজির দাম কমানো হয়েছে।
বিইআরসির নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৩২ টাকা ১২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের দামের তুলনায় এক টাকা তিন পয়সা কম। এর ফলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৫৯৮ টাকা থেকে কমে এক হাজার ৫৮৫ টাকা হয়েছে। আগস্ট মাসের তুলনায় নতুন দামে সিলিন্ডারপ্রতি দাম কমেছে ১৩ টাকা।
কিন্তু সুনামগঞ্জের বিভিন্ন খুচরা বাজারে নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান দেখা গেছে। অনেক ব্যবসায়ী ডিলারের কাছ থেকে গ্যাস কেনার পর পরিবহন, দোকান খরচসহ বিভিন্ন ব্যয়ের কথা বলে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় অতিরিক্ত ১০০ থেকে ২০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
নবীনগরের বাসিন্দা সবুজ বর্মন মধ্যবাজার থেকে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন এক হাজার ৭০০ টাকায়। তিনি বলেন, ‘সরকার গ্যাসের দাম কমিয়েছে। কিন্তু বাজারে এক দোকানের সঙ্গে আরেক দোকানের দামেরও মিল নেই। দুই তিনটি দোকান ঘুরে শেষ পর্যন্ত এক হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে গ্যাস কিনতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের নির্ধারিত দাম যদি এক হাজার ৫৮৫ টাকা হয়, তাহলে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কারণ কী এটি সংশ্লিষ্টদের দেখা উচিত।’
জামতলার বাসিন্দা সজীব আহমেদের অভিজ্ঞতাও একই। তাঁর ভাষ্য, দাম কমার পরও দোকান থেকে এক হাজার ৬৫০ টাকার নিচে ১২ কেজির গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি দাম নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতারা পুরোনো সিলিন্ডার এবং বেশি দামে কেনার কথা বলছেন।
সজীব আহমেদ বলেন, ‘সরকার দাম কমালেও বিক্রেতা সিন্ডিকেট আমাদেরকে সেই ফল ভোগ করতে দেয় না।’
মধ্যবাজারের এক খুচরা গ্যাস বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাদের কাছে আগের কেনা এবং বেশি দামে সংগ্রহ করা কিছু সিলিন্ডার রয়েছে। সে কারণেই সেগুলো বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
আরেক খুচরা বিক্রেতা তোফাজ্জল ইসলাম জানান, ডিলারের কাছ থেকে গ্যাস কিনে তিনি ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করেন। বর্তমানে তাঁর দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গ্যাস কেনাবেচার মেমো দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে বেশি দামে গ্যাস কেনার পর মেমো চাইলে ডিলারের পক্ষ থেকে তা দেওয়া হয়নি। বরং বলা হয়েছিল, মেমো দেওয়া যাবে না—গ্যাস নিলে নেন, না নিলে নাই। তবে অনেক সময় ক্রেতারাও মেমো চান না বলে জানান তিনি।
মধ্যবাজারের এলপিজি ডিলার মেসার্স ফারজানা মেশিনারীজের ম্যানেজার স্বাধীনের দাবি, তারা সরকার নির্ধারিত এক হাজার ৫৮৫ টাকাতেই ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।
বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই মাসের আগে ১২ কেজির গ্যাস এক হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। এখন সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতাদের মেমো না দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন স্বাধীন। তিনি বলেন, ‘এটি মিথ্যা কথা। আমরা সবাইকে মেমো দেই।’ মেমো দিলে ব্যবসার প্রচার ও বিশ্বাসযোগ্যতার দিক থেকেও ভালো হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শুধু সুনামগঞ্জ শহর নয়, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাজারেও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে এলপিজি বিক্রির চিত্র পাওয়া গেছে। সেখানে ১২ কেজির সিলিন্ডার এক হাজার ৬৫০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
উপজেলার নতুনপাড়া এলাকার ব্রয়লার এন্ড মুদি স্টোরে মেঘনা গ্রুপের ১২ কেজি ওজনের ‘ফ্রেশ’ এলপিজি সিলিন্ডার এক হাজার ৭০০ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা যায়।
দোকানের মালিক লিটন আহমেদ দাবি করেন, তিনি প্রতি সিলিন্ডার এক হাজার ৬০০ টাকা দরে পাইকারি কিনছেন। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো ভাউচার বা চালান তিনি দেখাতে পারেননি।
লিটন আহমেদের কাছে গ্যাস সরবরাহকারী সুনামগঞ্জ শহরতলির রাধানগর পয়েন্ট এলাকার মেসার্স তাওসিফ গ্যাস হাউসের কাছে গিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। সেখানে থাকা মুকসুদ আলী বলেন, লিটন আহমেদের কাছে ১২ কেজির প্রতি সিলিন্ডার এক হাজার ৫৬০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়েছে।
বিশ্বম্ভরপুরের পলাশ বাজারের রফিক স্টোরে একই কোম্পানির ১২ কেজির সিলিন্ডার এক হাজার ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি করছিলেন দোকানের মালিক রফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ডিলারের কাছ থেকে প্রতি সিলিন্ডার এক হাজার ৫৭০ টাকা দরে কিনেছেন। এ সময় দোকানে থাকা বিশ্বম্ভরপুরের গ্যাস ডিলার ভাই ভাই গ্যাসের মো. সুমন মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, কোম্পানি যে দরে তাদের কাছে গ্যাস সরবরাহ করছে, সেই অনুযায়ী তারা এক হাজার ৫৭০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
খুচরা ব্যবসায়ীরা তাহলে কত দামে গ্যাস বিক্রি করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে সুমন মিয়া বলেন, তারা এক হাজার ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি করবেন।
নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির বিষয়ে জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অফিসের সহকারী পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম মাসুদ বলেন, এলপিজি বিক্রি করতে হলে সরকারের নির্ধারিত দামেই বিক্রি করতে হবে।
তিনি বলেন, ভাউচারসহ বেশি দামে বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি 








