রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্ব অংশের যোগাযোগ দ্রুত করতে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটারের এই রুটে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি যেতে সময় লাগবে মাত্র ২৮ মিনিট। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা।
মেট্রোরেল-৫-এর দক্ষিণ রুট হিসেবে পরিচিত এই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে মেট্রোরেল চালুর লক্ষ্য রয়েছে। পুরো প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০৩২ সাল পর্যন্ত।
গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদগেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব, নাসিরাবাদ হয়ে দাশেরকান্দিতে শেষ হবে মেট্রোরেল-৫-এর দক্ষিণ রুট।
মোট ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই পথে থাকবে ১৫টি স্টেশন। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতালপথ এবং ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার থাকবে উড়ালপথে।
ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীতে নতুন করে সড়কের ওপর বড় অবকাঠামো নির্মাণ ও জমি অধিগ্রহণের চাপ কমানো এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যেই রুটটির বড় অংশ মাটির নিচে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী এই রুট ব্যবহার করতে পারবেন। প্রতিটি ট্রেনে একসঙ্গে ২ হাজার ৩১২ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে।
মেট্রোরেল চালু হলে সড়কে যানবাহনের চাপ কমার পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতে মানুষের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে সাশ্রয় হবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, মেট্রোরেল-৫ চালু হলে বছরে ২১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হতে পারে। একই সময়ে সড়ক থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৯টি যানবাহন কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বছরে কার্বন নিঃসরণ কমতে পারে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার টন।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনার পর সংশোধিত হিসাবে ব্যয় প্রায় ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা কমিয়ে ৪৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই অর্থের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। বাকি ৩২ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বৈদেশিক অর্থায়নের বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ কাজ করছে।
ইআরডির অতিরিক্ত সচিব এস এম জাকারিয়া হক জানান, প্রকল্পটির বৈদেশিক অর্থায়ন নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে অর্থায়নের কাঠামো নিয়ে আগেই সমঝোতা ছিল। প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশার কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রাথমিক প্রকৌশল নকশা, দরপত্রের প্রস্তুতি, জমি অধিগ্রহণ এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনার কাজও এগিয়েছে। ২০২২ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়। এ পর্যন্ত সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশার পেছনে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
পরিকল্পনা ছিল ২০২৩ সালে নির্মাণকাজ শুরু করার। কিন্তু প্রশাসনিক ও অর্থায়নসংক্রান্ত নানা জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। আগের সরকার পরিবর্তনের পরও সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব একনেকে উপস্থাপন করা যায়নি। ফলে প্রস্তুতিমূলক কাজ এগোলেও মূল নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব বলেন, বর্তমান সরকার প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে আগ্রহী। উন্নয়ন সহযোগীদের অবস্থানও আগের তুলনায় ইতিবাচক। একনেকে অনুমোদন মিললে পরবর্তী ধাপগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
মেট্রোরেল-৫-এর দক্ষিণ রুটকে শুধু একটি আলাদা যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে দেখছে না সরকার। এর মাধ্যমে মেট্রোরেল-৫-এর উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির পাশাপাশি মেট্রোরেল-২-এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এতে ভবিষ্যতে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তের যাত্রীরা একাধিক মেট্রোরেল রুট ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু একটি নতুন মেট্রোরেল রুট চালু করলেই এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। স্টেশনভিত্তিক বাস সংযোগ, পথচারীদের চলাচল, আন্তঃরুট সংযোগ এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো প্রত্যাশিত সংখ্যক যাত্রী আকর্ষণ নাও করতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান মনে করেন, মেট্রোরেল-৫ দক্ষিণ রুট জনবান্ধব প্রকল্প হলেও অন্য মেট্রোরেল প্রকল্পের তুলনায় এখানে যাত্রী চাহিদা তুলনামূলক কম হতে পারে। তার মতে, রেললাইন নির্মাণের পাশাপাশি স্টেশনগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
পাতাল অংশ বেশি হওয়ায় নির্মাণ ও পরিচালনা—দুই ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ থাকবে বলে মনে করেন তিনি। পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণে প্রযুক্তিগত জটিলতা বেশি এবং রক্ষণাবেক্ষণেও বাড়তি ব্যয় প্রয়োজন হয়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্য যাত্রীসংখ্যা ও ব্যয়ের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
দরপত্র ও ঠিকাদার নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অধ্যাপক হাদিউজ্জামান। তার মতে, নির্দিষ্ট প্রযুক্তি বা বিশেষায়িত নির্মাণপদ্ধতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে দরপত্রে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। এতে কাজ কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং প্রতিযোগিতামূলক দর পাওয়ার সুযোগও কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হকও প্রকল্পটির ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সক্ষমতা নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, মেট্রোরেল জনবান্ধব গণপরিবহন হলেও এত বড় ব্যয়ের প্রকল্পে শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়, ভবিষ্যতের পরিচালন ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
তার ভাষ্য, পাতাল মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, বায়ু চলাচল, আলো, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায়ও বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে। ফলে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাইয়ের সময় দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টি স্পষ্ট থাকা জরুরি।
মেট্রোরেল থেকে যাত্রীভাড়া বাবদ সম্ভাব্য আয় এবং পরিচালন ব্যয় মেটাতে সরকারের কতটা ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে, সেটিও আগেভাগে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক। তিনি বলেন, মেট্রোরেল-৬ এখনো পুরোপুরি লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। তাই নতুন ও বড় ব্যয়ের পাতাল মেট্রোরেলের ভবিষ্যৎ পরিচালন সক্ষমতা নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা আগে থেকেই থাকা প্রয়োজন।
রাজধানীর সড়কনির্ভর যাতায়াত কমানো এবং যানজটের কারণে নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টা, বাড়তি জ্বালানি খরচ ও বায়ুদূষণ কমানোর সম্ভাবনাই এই প্রকল্পের অন্যতম প্রত্যাশিত সুফল। নির্দিষ্ট সময়সূচি ও দ্রুতগতির মেট্রোরেল চালু হলে এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
অর্থনীতি ডেস্ক 








