সুনামগঞ্জের ছাতকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতা হাজি স্বপন মিয়াকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। ওসির প্রত্যাহারের দাবিতে সোমবার রাতে পৌর শহরে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বিক্ষোভকারীরা ওসি মিজানুর রহমানকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য, রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ছাতক শহরের তাহির প্লাজার সামনে আসেন হাজি স্বপন মিয়া। এ সময় স্থানীয় শতাধিক মানুষ তাকে অটোরিকশা থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খবর পেয়ে ওসি মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজি স্বপনকে হেফাজতে নেয়। পরে আহত অবস্থায় তাকে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য পুলিশি পাহারায় তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তবে এরপর হাজি স্বপনের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না কিংবা বর্তমানে কোথায় আছেন এসব বিষয়ে পুলিশ স্পষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার পর থেকে হাজি স্বপনকে নিয়ে পুলিশের বক্তব্যও ছিল অস্পষ্ট। রোববার রাত থেকে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত থানার ওসির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তারা জানান। স্থানীয় সাংবাদিকেরাও ওসির বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন বলে দাবি করেন।
বিক্ষোভকারীদের একাংশের অভিযোগ, হাজি স্বপন মিয়ার সঙ্গে ওসি মিজানুর রহমানের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় না থাকলেও ওই নেতার বাসায় ওসির নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
এই সম্পর্কের কারণেই পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর হাজি স্বপনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
হাজি স্বপন মিয়া দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের সারপিননগর গ্রামের মৃত আব্দুল মতিনের ছেলে। বর্তমানে তিনি ছাতক পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মামলা-হামলায় হয়রানি, জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল এবং চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতাকে হুমকি দেওয়া এবং বর্তমানে সীমান্তে চোরাচালান, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ডেও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এসব বিষয়ে থানার ওসিকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।
তবে হাজি স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের তাৎক্ষণিক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে পুলিশ হেফাজত থেকে তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে—এ অভিযোগের পক্ষেও সরকারি কোনো নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় হাজি স্বপন মিয়াকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সিলেটের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিতে পুলিশের সহযোগিতায় তাকে হাসপাতাল থেকে বের করে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার দৃশ্য দেখা যায়।
সোমবার রাত ৮টার দিকে ছাতক পৌর শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন স্থানীয়রা। পরে রইছ বোর্ডিং-সংলগ্ন প্রধান সড়কে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়।
সমাবেশে বক্তারা হাজি স্বপনকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের তদন্ত এবং ওসি মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহারের দাবি জানান।
তারা বলেন, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব কিংবা পুলিশের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে আইন প্রয়োগে ভিন্নতা তৈরি হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তাই প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ঘটনার তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানান তারা।
সমাবেশে বক্তব্য দেন ছাতক পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর জসিমউদ্দীন সুমেন, পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন সালমান, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বাকি বিল্লাহ এবং উপজেলা জাসাসের আহ্বায়ক আব্দুল আলীম।
এ সময় ছাতক পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য তানিমুল ইসলাম তানিম, সাবেক পৌর ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুনেম মামনুন, পৌর যুবদলের সদস্য নোমান ইমদাদ কানন, সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ছাতক উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আব্দুল বাকী মুহিত, বিএনপি নেতা জাহির উদ্দিন দিনান, গোলাম দস্তগীর জীবন, ঝুমন আহমেদ, সোনা আলী, সিফাত, তানভীর, ঈদরাকসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
অভিযোগের বিষয়ে ছাতক থানার ওসি মিজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে সোমবার রাতে থানায় গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। তার অফিসকক্ষও তালাবদ্ধ ছিল।
পরে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে হাজি স্বপন মিয়াকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ এবং তার সঙ্গে ওসির কথিত ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে মিজানুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি 








