কুলাউড়ায় রাবার শিল্পে সংকট, পুরোনো গাছ ও বাড়তি খরচে বাড়ছে লোকসান
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৯ PM

কুলাউড়ায় রাবার শিল্পে সংকট, পুরোনো গাছ ও বাড়তি খরচে বাড়ছে লোকসান

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৫/০৯/২০২৬ ১০:২০:৪৯ AM

কুলাউড়ায় রাবার শিল্পে সংকট, পুরোনো গাছ ও বাড়তি খরচে বাড়ছে লোকসান


একসময় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত ছিল মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার রাবার শিল্প। স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার অনেক মানুষ এই শিল্পের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। গাছের বয়স বেড়ে উৎপাদন কমে যাওয়া, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, বাজারদরের ওঠানামা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সংকটসহ নানা কারণে এখন লোকসানের মুখে পড়েছে এ শিল্প।

কুলাউড়ার রাবার শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো গাছ সরিয়ে উচ্চ ফলনশীল নতুন গাছ লাগানো, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে পারলে এ খাত আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

সিলেট বিভাগে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের অধীনে থাকা চারটি সরকারি রাবার বাগানের একটি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নে অবস্থিত ভাটেরা রাবার বাগান। এর বাইরে চা বাগান পরিচালিত এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ছোট-বড় আরও ১৮টি রাবার বাগান রয়েছে কুলাউড়ায়।

ভাটেরা সরকারি রাবার বাগানে ২ হাজার ৮৯৯ একর বন ভূমিজুড়ে রাবার চাষ করা হচ্ছে। তবে এর বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে পুরোনো গাছ। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন দেওয়ার পর এসব গাছের অনেকগুলোই এখন উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়েছে।

বাগান সূত্রে জানা গেছে, একটি রাবার গাছ সাত বছর বয়স থেকে ২৮ বছর পর্যন্ত লেটেক্স উৎপাদন করতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে এর উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়। ভাটেরা রাবার বাগানেও কয়েক বছর ধরে উৎপাদন কমার পাশাপাশি লোকসান বাড়ছে। ২৫-২৬ অর্থবছরে বাগানটির লোকসানের পরিমাণ হয়েছে ২ কোটি টাকা। এ সময়ে খরচ হয়েছে ৮ কোটি টাকা।

বাগানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদনক্ষমতা হারানো পুরোনো রাবার গাছ কেটে সেখানে নতুন গাছ লাগানো এখন জরুরি। পাশাপাশি আধুনিক মেশিনারিজের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণ, উচ্চ ফলনশীল চারা রোপণ এবং উৎপাদন ব্যয় কমানো গেলে সম্ভাবনাময় এই শিল্পের বর্তমান সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

ভাটেরা রাবার বাগানের ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির আমার দেশকে বলেন, ২৫-২৬ অর্থবছরে বাগানে ২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে এবং খরচ হয়েছে ৮ কোটি টাকা। তবে লোকসান সত্ত্বেও তারা আশার আলো দেখছেন।

তিনি জানান, পুরোনো গাছ সরিয়ে বন ভূমিতে নতুন রাবার গাছ লাগানো হচ্ছে। এরই মধ্যে ৭০ একরজুড়ে নতুন গাছ লাগানোর কাজ শেষ হয়েছে। সনাতনী পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক ধূমঘর তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এসব কাজ শেষ হলে রাবার শিল্পের উৎপাদন ও সম্ভাবনা বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।

বর্তমানে ভাটেরা রাবার বাগানে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ২৫০ শ্রমিক কাজ করছেন। স্থায়ী শ্রমিকের প্রতি মাসের বেতন ৩০ হাজার টাকা, আর অস্থায়ী শ্রমিকের বেতন প্রায় ১৫ হাজার টাকা।

ব্যবস্থাপক জানান, বর্তমানে নতুন ও পুরোনো গাছ মিলিয়ে প্রতিদিন ২ হাজার কেজি রাবারের কষ উৎপাদন হচ্ছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঠান্ডা আবহাওয়া থাকলে লেটেক্স উৎপাদন দ্বিগুণ হয়। নতুন গাছগুলো ছয়-সাত মাস বয়সি হলে সেগুলো থেকেও লেটেক্স উৎপাদন বাড়বে বলে তারা আশাবাদী।

তার ভাষ্য, সিলেট অঞ্চলের বন ভূমিতে উৎপাদিত রাবার গুণে ও মানে ভালো। এই লেটেক্স থেকে তৈরি রাবার দিয়ে কনডম, গাড়ি ও বিমানের চাকা এবং টিউব তৈরি হয়। শ্রীলঙ্কা ও ভারতে এখানকার রাবার রপ্তানি করা হয়।

তবে শুধু সরকারি বাগান নয়, বেসরকারি ও চা বাগান পরিচালিত রাবার বাগানগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়।

কুলাউড়ার টিলাগাঁও ইউনিয়নের ব্রিটিশ মালিকানাধীন ডানকানের লংলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, চা বাগানের পাশাপাশি তাদের টিলা ভূমির ২৫৫ হেক্টর জায়গায় রাবার চাষ হচ্ছে। কিন্তু গাছগুলোর বয়স অনেক বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে। শ্রমিকদের পারিশ্রমিক পরিশোধের পর তারা লাভ করতে পারছেন না। তার মতে, বর্তমানে রাবার শিল্প দুর্দিনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

কুলাউড়ার জয়চন্ডী ইউনিয়নের ন্যাশনাল টি কোম্পানির মালিকানাধীন বিজয়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির তালুকদার জানান, তাদের বাগানে চায়ের পাশাপাশি ৯৮ হেক্টর টিলা ভূমিতে রাবার চাষ হচ্ছে। উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়লেও তা এখনো আশানুরূপ নয়।

ভাটেরা রাবার বাগানের টেপার জামান মিয়াও শিল্পটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান। তার মতে, পুরোনো গাছগুলো সরিয়ে নতুন গাছ লাগানো ছাড়া রাবার শিল্পকে এগিয়ে নেওয়া কঠিন।

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সাত থেকে ২৮ বছর বয়সি একটি রাবার গাছ সঠিক মৌসুমে প্রতিদিন হাফ কেজি রাবারের কষ দিতে পারে। কিন্তু গাছের বয়স বাড়ার সঙ্গে উৎপাদন ক্ষমতা কমতে থাকে এবং তা অর্ধেকের নিচে নেমে আসে।

জামান মিয়ার মতে, রাবার পুড়ানোর জন্য আধুনিক ধূমঘরও প্রয়োজন। ভাটেরা বাগানের বর্তমান ধূমঘরের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। তার মতে, বন ভূমির অধিকাংশ রাবার গাছের বয়স বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়াই এখন এ শিল্পের অন্যতম বড় সমস্যা।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর