কৃষ্ণপুর গণহত্যার ৫৫ বছর, ১২৭ নিহতকে শহীদের স্বীকৃতির দাবি
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০০ PM

কৃষ্ণপুর গণহত্যার ৫৫ বছর, ১২৭ নিহতকে শহীদের স্বীকৃতির দাবি

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৮/০৯/২০২৬ ০৮:০২:৪৫ PM

কৃষ্ণপুর গণহত্যার ৫৫ বছর, ১২৭ নিহতকে শহীদের স্বীকৃতির দাবি


১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার কৃষ্ণপুরে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে নিহত ১২৭ জনকে শহীদের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উঠেছে। গণহত্যার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও নিহতরা এখনো শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

শুক্রবার কৃষ্ণপুর গণহত্যা দিবস উপলক্ষে নিহতদের স্মরণে বধ্যভূমিতে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কালো পতাকা উত্তোলন এবং এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। গ্রামবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি, শহীদ পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। পরে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণসভা।

স্থানীয় প্রবীণ ও বিভিন্ন সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ওই দিন ভোরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় সহযোগী রাজাকার-আলবদর সদস্যরা কৃষ্ণপুরে অভিযান চালায়। কমলাময়ী উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে ১৩১ জন হিন্দুকে জড়ো করে গুলি চালানো হয়। এতে ১২৭ জন নিহত হন। পরে নিহতদের মরদেহ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয়দের বর্ণনায় জানা যায়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নথিতেও ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ কৃষ্ণপুরে পাকিস্তানি বাহিনী, রাজাকার ও আলবদর সদস্যদের অভিযানের কথা উল্লেখ রয়েছে। ওই ঘটনায় গণহত্যা, অপহরণ, আটক ও নির্যাতনসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কৃষ্ণপুর ছিল বৃহত্তর সিলেট জেলার একটি প্রত্যন্ত হাওরগ্রাম। যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় যুদ্ধের প্রথম ছয় মাস সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর তেমন তৎপরতা ছিল না। ফলে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক হিন্দু পরিবার সেখানে আশ্রয় নেয়। দুর্গম হাওর হওয়ায় পাকিস্তানি সেনারা গ্রামটিতে পৌঁছাতে পারবে না এমন ধারণা ছিল তাঁদের।

স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, লাখাই এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর প্রথম ক্যাম্প ছিল মানপুরে। পরে স্বজনগ্রামের টাউনশিপে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ এবং যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যার কারণে একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা লাখাইয়ের ক্যাম্প গুটিয়ে অষ্টগ্রামে চলে যায়।

স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর অষ্টগ্রামে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে কৃষ্ণপুরে হামলার পরিকল্পনা করা হয়। পরদিন গভীর রাতে রাজাকাররা নৌকা, স্পিডবোট ও লঞ্চ নিয়ে কৃষ্ণপুরে গিয়ে গ্রামটি ঘিরে ফেলে।

১৮ সেপ্টেম্বর ভোর চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে অষ্টগ্রামের সেনা ক্যাম্প থেকে একটি স্পিডবোট ও ১০ থেকে ১২টি বড় নৌকায় পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল কৃষ্ণপুরে আসে। তাঁদের সঙ্গে ছিল লাখাই, নাসিরনগর ও অষ্টগ্রাম এলাকার ৪০ থেকে ৫০ জন রাজাকার ও আলবদর সদস্য।

গ্রামে প্রবেশের পরই গুলি চালানো শুরু হয় বলে স্থানীয়দের বর্ণনা। রাজাকাররা বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে এবং পরে কয়েকটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, কমলাময়ী উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে ১৩১ জনকে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করানো হয়। এরপর ব্রাশফায়ার করা হলে ১২৭ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। প্রিয়তোষ রায়, নবদ্বীপ রায় ও হরিদাস রায় গুলিবিদ্ধ হয়েও প্রাণে বেঁচে যান। তবে তাঁদের শরীরে স্থায়ী ক্ষতি হয়। নবদ্বীপ রায় ও প্রিয়তোষ রায় পরবর্তী সময়ে মারা যান।

কৃষ্ণপুরের পাশাপাশি আশপাশের লালচাঁদপুর ও গোকুলনগরেও হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। লালচাঁদপুরে মধু নমঃশূদ্রের বাড়িতে ৫১ জন এবং গোকুলনগরে আটজন হিন্দুকে হত্যা করা হয় বলে জানা যায়। তিনটি স্থানে মোট ১৮৬ জন নিহত হন বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়।

সেদিন প্রাণ বাঁচাতে অনেকে জঙ্গল, পুকুর ও ডোবায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। যুদ্ধাহত দয়াল দাশ জানান, পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে ঢোকার খবর পেয়ে তিনি কয়েকজন নারীর সঙ্গে বাড়ির পেছনের জঙ্গলে আশ্রয় নেন। পরে কয়েকজন নারী ডোবার পানিতে নেমে কচুরিপানার আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন।

দয়াল দাশের ভাষ্য, জঙ্গল থেকে পানিতে নামার সময় তিনি পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়েন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, সেখানে আর কেউ আছে কি না। তিনি কাউকে না থাকার কথা বলায় কচুরিপানার আড়ালে থাকা নারীরা রক্ষা পান।

পরে দয়াল দাশকে একটি বাড়িতে নিয়ে হাত বেঁধে রাইফেলের বাঁট দিয়ে মারধর করা হয়। এতে তাঁর হাত-পায়ের কয়েকটি হাড় ভেঙে যায়। পাকিস্তানি সেনারা চলে যাওয়ার পর স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

যুদ্ধাহত জ্ঞানেন্দ্র চন্দ্র রায়ের ছেলে শুভ রায় জানান, তাঁর বাবাকেও অন্যদের সঙ্গে সারিবদ্ধ করে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে হাত পেছনে বেঁধে গুলি করা হয়েছিল। গুলি তাঁর দুই হাতের তালু ভেদ করে বেরিয়ে যায়। স্থানীয়রা পরে তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেন। ঘটনার পর তিনি আরও ২৭ বছর বেঁচে ছিলেন। তবে তাঁর দুই হাতের চারটি আঙুল অকেজো হয়ে যায়।

কৃষ্ণপুর গণহত্যার ঘটনায় ২০১০ সালের ৪ মার্চ যুদ্ধাহত হরিদাস রায় রাজাকার লিয়াকত আলীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। মামলা করার পর তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনায় ওই বছরের ৭ জুন লাখাই থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়।

পরে ২০১০ সালের ১২ আগস্ট কৃষ্ণপুর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গ্রহণ করা হয়। লিয়াকত আলী ও আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলীর বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও লুটপাটসহ সাতটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলী এবং লিয়াকত আলীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেন।

পরে ২০২২ সালের ৩ জুলাই ঢাকার কলাবাগান এলাকা থেকে রজব আলীকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব-২। লিয়াকত আলী বিদেশে পালিয়ে আছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। রজব আলীর গ্রেপ্তারের তথ্য বাসসের প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা কেশব চন্দ্র রায় বলেন, সিলেট বিভাগের আর কোথাও কৃষ্ণপুরের মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নজির নেই। স্বাধীনতার ৫৫ বছর হতে চললেও কৃষ্ণপুর গণহত্যায় নিহত ১২৭ জন এখনো শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি। তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় বাস্তবায়নের দাবি জানান।

শহীদদের স্মরণে গ্রামবাসীর উদ্যোগে ২০১৭ সালে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে স্মৃতিসৌধ ও বধ্যভূমি নির্মাণ করা হয়। হবিগঞ্জ জেলা পরিষদ এ কাজে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল।

এরপর থেকে প্রতিবছর ১৮ সেপ্টেম্বর সেখানে শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন গ্রামবাসী। এবারের কর্মসূচি সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দা অতুল প্রসাদ রায় বলেন, দেশের চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার স্বল্প পরিসরে আয়োজন করা হয়েছে। স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কালো পতাকা উত্তোলন, এক মিনিট নীরবতা পালন এবং আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হয়।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর