৫ কোটি ২৬ লাখ টাকার আইসিটি কেন্দ্র ৮ বছরেও শেষ হয়নি, ব্যাহত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ
বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৮ PM

৫ কোটি ২৬ লাখ টাকার আইসিটি কেন্দ্র ৮ বছরেও শেষ হয়নি, ব্যাহত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ

শেখ ইমন আহমেদ, মাধবপুর (হবিগঞ্জ) থেকে

প্রকাশিত: ০১/১০/২০২৬ ১০:২২:৪০ AM

৫ কোটি ২৬ লাখ টাকার আইসিটি কেন্দ্র ৮ বছরেও শেষ হয়নি, ব্যাহত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ

২৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সাতটি মাদ্রাসা ও দুটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের কথা থাকলেও এখনো চালু হয়নি কেন্দ্রটি।


পাঁচ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণের উদ্যোগ, ২০ মাসের নির্ধারিত সময়সীমা এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় আট বছর। তবু চালু হয়নি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা সম্পদ কেন্দ্র। ২০১৮ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা থমকে আছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

শিক্ষকদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা এবং শিক্ষাতথ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যেই মাধবপুরে কেন্দ্রটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে কম্পিউটার কক্ষ, তথ্যকেন্দ্র, সার্ভার কক্ষ, সভাকক্ষসহ প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধা থাকার কথা।

সরকারি দরপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপনসহ সংশ্লিষ্ট কাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সময় দেওয়া হয়েছিল ২০ মাস। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের কয়েক গুণ পেরিয়ে গেলেও কেন্দ্রটি চালু করা সম্ভব হয়নি।

ভিত্তিপ্রস্তরের পর দীর্ঘ স্থবিরতা

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) ও দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের মূল ঠিকাদার হিসেবে রয়েছে বিওএফ কোরিয়া।

২০১৮ সালে কেন্দ্রটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও এরপর দীর্ঘ সময় নির্মাণকাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। ২০২২ সালের মার্চে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) সংশ্লিষ্টদের কাছে নির্মাণকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয়। কিন্তু এরপরও কয়েক বছর প্রকল্পটির নির্মাণকাজ কার্যত থমকে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর বর্তমানে আবারও নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ‘ট্রাস্টেড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এখন কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ করছে।

প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী রকিবুল ইসলাম রোমান বলেন, “আমরা জুন মাসে এখানে এসে কাজ শুরু করেছি। আমরা এসে শুধু ভবনের ভিত্তির কাজ সম্পন্ন অবস্থায় পেয়েছি। আমাদের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।”

তবে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ আটকে থাকার পর বর্তমানে নির্মাণকাজের গতি কতটা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো প্রকল্প শেষ করা সম্ভব হবে কি না এসব বিষয় নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

বাড়ল প্রকল্প ব্যয়, নতুন বরাদ্দের তথ্য মেলেনি

নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে কি না জানতে চাইলে ‘ট্রাস্টেড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’র সাইট প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম সাগর জানান, প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। তবে নতুন বরাদ্দের পরিমাণ সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য দিতে চাননি।

ফলে প্রকল্পটির মূল ব্যয় ৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা থেকে বর্তমানে কত হয়েছে, দীর্ঘসূত্রতার কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ কত এবং সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় কার এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

নির্মাণকাজের অগ্রগতি ও দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে মাধবপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, “আগে কী হয়েছে, না হয়েছে সেদিকে যাব না। তবে এখন যেহেতু কাজ চলমান আছে, তাই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই যাতে নির্মাণকাজ শেষ হয়, সেদিকে নজর রাখব।”

সরকারি নথিতেও প্রকল্পের সময়কাল নিয়ে ভিন্ন তথ্য

মাধবপুরের এই আইসিটি প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা সম্পদ কেন্দ্র প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল নিয়েও সরকারি বিভিন্ন নথিতে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। একটি সরকারি তথ্যে প্রকল্পের সময়কাল ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। আবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের প্রকল্প তালিকায় বাস্তবায়নকাল ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেখানো হয়েছে।

প্রকল্পের সময়কাল নিয়ে সরকারি নথিতে এমন পার্থক্য থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকল্পটির সংশোধিত সময়সীমা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা কী এবং এর বর্তমান অগ্রগতি কোন পর্যায়ে রয়েছে।

সুবিধা পাওয়ার কথা ৩৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের

মাধবপুরে প্রকল্পটির আওতায় ২৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সাতটি মাদ্রাসা ও দুটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। অর্থাৎ উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষকদের প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়ন ও আধুনিক শিক্ষাতথ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা ছিল কেন্দ্রটির।

কিন্তু ভবন নির্মাণ শেষ না হওয়ায় পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা এখনো চালু করা যায়নি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি অবকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে শুধু একটি ভবনের ব্যবহার বিলম্বিত হচ্ছে না; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পুরো উদ্যোগও।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, নির্মাণকাজ শেষ করতে যেখানে মাত্র ২০ মাস সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেখানে একটি উপজেলা পর্যায়ের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা সম্পদ কেন্দ্র নির্মাণে এত দীর্ঘ সময় লাগল কেন? নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, প্রকল্পের সময় কেন বাড়ানো হয়েছে এবং সময় বাড়ার কারণে ব্যয় কতটা বেড়েছে এসব বিষয়ও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

আট বছর ধরে নির্মাণাধীন এই কেন্দ্র এখন আবার কাজের মধ্যে ফিরলেও মাধবপুরের মানুষের প্রত্যাশা একটাই আর যেন সময়ক্ষেপণ না হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা গেলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার জন্য যে অবকাঠামো তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল, সেটিও অবশেষে বাস্তব সুবিধায় রূপ নিতে পারবে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর