একটি সনদের জন্য কখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আবার কখনো একই কাজের জন্য যেতে হচ্ছে একাধিকবার। সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ৪২টি ওয়ার্ডে নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুসনদ, নাগরিকত্ব ও ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা পেতে এমন ভোগান্তির মুখে পড়ছেন নগরবাসী।
নাগরিকদের অভিযোগ, অনলাইনে সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অধিকাংশ ওয়ার্ডে এখনও তা পুরোপুরি চালু হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ম্যানুয়ালি আবেদন করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ওয়ার্ড কমিশনারের দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক ব্যস্ততা। অফিস সময়ের বাইরে তাদের পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি সভা বা সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকলে সেবাপ্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলরদের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে সিসিক। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় ওয়ার্ড পর্যায়ে নাগরিক সেবা ও স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ১৪ জন কর্মকর্তাকে সিলেট সিটি করপোরেশনের ৪২টি ওয়ার্ডের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিজ নিজ দপ্তরের কাজের পাশাপাশি তারা ওয়ার্ড কমিশনারের দায়িত্বও পালন করছেন।
সাধারণত ওয়ার্ড কমিশনারের কার্যালয় থেকেই জন্মনিবন্ধন ও মৃত্যুসনদ, নাগরিকত্ব, চারিত্রিক, ওয়ারিশ ও ভূমিহীন সনদসহ বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়। পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব খোলা, জমির মালিকানা পরিবর্তনসহ নানা কাজেও জনপ্রতিনিধির সত্যায়ন বা সুপারিশ প্রয়োজন হয়। নির্বাচিত কাউন্সিলররা দায়িত্বে থাকাকালে এসব সেবা তুলনামূলকভাবে সহজে পাওয়া যেত বলে জানান নগরবাসী।
সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার পর শুরুতে ওয়ার্ড পর্যায়ে সেবা পেতে আরও বেশি ভোগান্তির অভিযোগ ওঠে। পরে নাগরিক সেবা অনলাইনে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিছু ওয়ার্ডে এ ব্যবস্থা চালু হলেও অধিকাংশ ওয়ার্ডে এখনও আবেদন ও সনদ প্রদানের কাজ চলছে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে।
নগরবাসীর আরেকটি অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে নির্দিষ্ট অফিস সময়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অথচ এসব কর্মকর্তাকে একই সময়ে নিজ নিজ সরকারি দপ্তরের দায়িত্বও পালন করতে হয়। ফলে জরুরি প্রয়োজনে সেবা নিতে গিয়ে অনেককে বারবার কার্যালয়ে আসতে হচ্ছে। সরকারি ছুটির দিনে ওয়ার্ড পর্যায়ের নাগরিক সেবাও বন্ধ থাকে।
অনলাইন সেবা চালুর ক্ষেত্রেও সব ওয়ার্ডে সমান অগ্রগতি হয়নি। কিছু ওয়ার্ড সচিবের প্রযুক্তিগত দক্ষতার সীমাবদ্ধতার কারণে অনলাইনের বদলে ম্যানুয়ালি আবেদন করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অনলাইন ব্যবস্থা চালু থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সেবাপ্রার্থীদের অতিরিক্ত বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।
নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফয়সল আহমেদ বলেন, ওয়ার্ড কমিশনারের দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তাকে জরুরি প্রয়োজনে পাওয়া যায় না। অসংখ্যবার ফোন করেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে তার কার্যালয়ে গিয়েও দেখা করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, “আরও বড় সমস্যা হলো সিসিকের কিছু কিছু ওয়ার্ড সচিবের প্রযুক্তিগত দক্ষতা নেই। তারা না বোঝার কারণে ম্যানুয়ালি আবেদন করতে হয়। এতে বিভিন্নভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়।”
১১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জয়নাল আবেদিনের অভিযোগ, ওয়ার্ড কমিশনারের কার্যালয় থেকে সেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শেষ নেই। তাঁর ভাষায়, একটি কাগজের জন্য দপ্তরে দপ্তরে ধরনা দিতে হয়। বাধ্য হয়ে অনেকে দালালের মাধ্যমে কাজ করিয়ে নেন।
তবে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তানভীর হোসাইন অনলাইন সেবা নিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অনলাইন পদ্ধতি চালু হওয়ায় সহজেই সেবা পাওয়া যাচ্ছে। অনেক সময় ঘরে বসেও সেবা পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে জানতে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাড়া দেননি।
সিসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা নেহার রঞ্জন পুরকায়স্থ বলেন, অনেক ওয়ার্ডে অনলাইন সেবা এখনও চালু হয়নি। কাজ চলমান রয়েছে। অনলাইন সেবা পুরোপুরি চালু হলে মানুষ সহজেই সেবা পাবেন।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









