দখল-চাঁদাবাজির অভিযোগে কঠোর বিএনপি, শুদ্ধি অভিযানের আভাস
বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৯ AM

দখল-চাঁদাবাজির অভিযোগে কঠোর বিএনপি, শুদ্ধি অভিযানের আভাস

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭/১০/২০২৬ ০৯:৪৯:৫৮ AM

দখল-চাঁদাবাজির অভিযোগে কঠোর বিএনপি, শুদ্ধি অভিযানের আভাস


দল ও সরকারের নাম ব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি, হামলা-ভাঙচুর কিংবা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ যেন আর রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে না থাকে এবার সে বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে পদ-পদবি বা দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে সাংগঠনিক শাস্তির পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তা দিয়েছে দলটির হাইকমান্ড।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই নেতাকর্মীদের অন্যায় ও অপকর্ম থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। এতে সরকারের পাশাপাশি দলের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

বিশেষ করে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবার দৃশ্যত কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ওই ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। ১ অক্টোবর তিনি পদত্যাগ করেন। পরে তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করে জাতীয় সংসদ সচিবালয়।

এরপর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সময়ে বিএনপির তিনজন, ছাত্রদলের পাঁচজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুজন এবং শ্রমিক দলের চারজনসহ মোট ১৪ জন নেতাকর্মীকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।

মিরপুরের ঘটনায় কঠোর বার্তা

ঘটনার সূত্রপাত ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে। অভিযোগ অনুযায়ী, মিরপুর-১ নম্বর এলাকার রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে দুই শতাধিক সশস্ত্র ব্যক্তি হামলা চালায়। দেশীয় অস্ত্র ও ভারী সরঞ্জাম নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করে নিরাপত্তারক্ষীদের জিম্মি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা ও নগদ টাকা লুট করা হয়। একটি পাকা ও তিনটি আধা-পাকা ভবনও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এরপর সেখানে একটি সমবায় সমিতির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করা হয়।

মামলায় স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মীর নাম আসে। তাদের একটি অংশ সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মিষ্টি অবশ্য ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং সূত্রের বরাতে জানা যায়, ঘটনা ও তদন্তের তথ্য পর্যালোচনার পর প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। ১ অক্টোবর নির্দেশ পাওয়ার পর সংসদ ভবনে গিয়ে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দেন তিনি। পরে প্রজ্ঞাপন জারি করে তার আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।

২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে সংরক্ষিত মহিলা আসন-২৩ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। তিনি বিএনপির প্রয়াত নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন এবং মিরপুরের সাবেক কাউন্সিলর প্রয়াত সাইদুর রহমান নিউটনের স্ত্রী।

এক হাজারের বেশি নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে ১ হাজার ২৩ জন নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তাদের মধ্যে ৫২৩ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ, ৪৩৭ জনকে বহিষ্কার, ২৪ জনের পদ স্থগিত, ৩৫ জনকে সতর্ক এবং চারজনকে চূড়ান্ত শৃঙ্খলাভঙ্গের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

দলীয় সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে শুরু করে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পরও এই ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে সহযোগিতাও করেছেন।

তবে এত পদক্ষেপের পরও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না বলে স্বীকার করছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের কেউ কেউ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক প্রভাবশালী ভাইস চেয়ারম্যান ঢাকা মেইলকে বলেন, অন্যায়-অপকর্মের অভিযোগ ওঠার পরও কেউ আর নির্বিঘ্নে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারবেন না। তার ভাষায়, প্রমাণ পাওয়া গেলে আগে বহিষ্কার এবং পরে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যত বড়ই হোক, দল তার অপকর্মের দায় নেবে না।

মিরপুরের পর দেশের অন্য এলাকাতেও ব্যবস্থা

শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল, হামলা ও সন্ত্রাসের অভিযোগে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার খবর এসেছে।

বরিশালের গৌরনদীতে এক ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগে একাধিক নেতাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। জমি ও দোকান দখলের অভিযোগে সাবেক এক যুবদল নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

টঙ্গী ও গাছা এলাকায় তৈরি পোশাক কারখানাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি এবং কারখানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগেও একাধিক বিএনপি নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন।

খুলনায় ব্যবসায়ী অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে মহানগর বিএনপির নেতা পিয়ারু ও সাদাতকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। চট্টগ্রামে সরকারি জমি দখল এবং সিরাজগঞ্জে চেম্বার অব কমার্স কার্যালয় দখলের অভিযোগে কয়েকজন নেতাকে শোকজ করা হয়েছে। নোয়াখালীতে তদন্তের পর দখল ও চাঁদাবাজিতে জড়িত তিন নেতাকে স্থায়ী অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

সবশেষ ঢাকায় সোমবার রাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে এক ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশের অভিযানও জোরদারের ঘোষণা

দলীয় পরিচয়ে অপরাধের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে।

সচিবালয়ে সম্প্রতি তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তথ্য পুলিশের ডেটাবেজে সংরক্ষিত থাকে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা হালনাগাদ করা হয়। অপরাধীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান আগে যেমন চলেছে, এখনো চলছে এবং সামনে আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।

সামনে ‘শুদ্ধি অভিযান’?

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির ভেতরে সাংগঠনিকভাবে আরও বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযানের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স ঢাকা মেইলকে বলেন, অন্যায়-অপকর্মে জড়িত কাউকেই দল ছাড় দিচ্ছে না। তারপরও কিছু বিপথগামী নেতাকর্মী অপরাধে জড়াচ্ছেন; তাদের মধ্যে সম্প্রতি বিএনপিতে যোগ দেওয়া কিছু লোকও রয়েছেন।

দলের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে সারাদেশে বড় ধরনের ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালানো দরকার বলে মনে করেন তিনি।

বিএনপির নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে এখন যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করলে রাজনৈতিক পদ-পদবি আর সুরক্ষা হিসেবে কাজ করবে না। মিরপুরের ঘটনায় নেওয়া পদক্ষেপকে তারা সেই নীতিরই বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর