সিলেট থেকে ঢাকায় যাতায়াত করতে গিয়ে সড়ক ও রেল দুই পথেই ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ চলায় সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও ভাঙাচোরা রাস্তা, কোথাও দীর্ঘ যানজট। অন্যদিকে ট্রেনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বড় বাধা টিকিটের সংকট। অনলাইনে টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রেল যোগাযোগ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিলম্ব। নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর ঘোষণা থাকলেও ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’ এখনো চলাচল শুরু করেনি। ঢাকা-সিলেট রেলপথে ডাবল লাইন নির্মাণের উদ্যোগও এগোয়নি প্রত্যাশিত গতিতে। ফলে যাতায়াতের সময়, খরচ ও স্বস্তি সব দিক থেকেই চাপের মুখে পড়ছেন সিলেটের মানুষ।
সিলেট থেকে ঢাকাগামী উপবন, কালনী, জয়ন্তিকা ও পারাবত এক্সপ্রেস এবং চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেসের টিকিট অনলাইনে প্রকাশের পরপরই শেষ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ যাত্রীরা টিকিট না পেলেও পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বেশি দামে টিকিট বিক্রির অভিযোগ উঠছে।
বিষয়টি নজরে আসে সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল নোমানের। ট্রেনের টিকিট বিক্রির সরকারি ওয়েবসাইট পরিদর্শন করে তিনি দেখতে পান, নির্দিষ্ট দিনের টিকিট বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক টিকিট বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এত অল্প সময়ে টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তাঁর কাছে সন্দেহজনক মনে হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে স্বপ্রণোদিত হয়ে মিস মামলা নং-০১/২০২৬ দায়ের করেন আবদুল্লাহ আল নোমান। মামলায় কালোবাজারি ও মজুদদারির মতো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেট। গত ৭ অক্টোবর মামলার নথিপত্র সংস্থাটির কাছে পৌঁছায়। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন পিবিআই সিলেটের উপপরিদর্শক আবদুল আহাদ। তিনি জানিয়েছেন, আদালতের স্বপ্রণোদিত হয়ে দায়ের করা মামলাটিই তিনি তদন্ত করছেন।
মামলার নথিতে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, টিকিট বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কারও কারও সহযোগিতায় একটি চক্র দ্রুত টিকিট সরিয়ে নিয়ে পরে বেশি দামে যাত্রীদের কাছে বিক্রি করে থাকতে পারে। এতে সাধারণ যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন; পাশাপাশি সিলেটের পর্যটনশিল্পের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিট সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার এক থেকে পাঁচ দিন আগেই অবৈধভাবে ব্লক করে রাখার ঘটনা ঘটেছে।
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, অনলাইন টিকিট বিক্রি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান সহজ ডট কমের (Shohoz.com) কর্মীদের হাতে সিস্টেমের মূল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী তাঁদের দায়িত্ব ছিল কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু বিভিন্ন স্টেশনের প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করা ও আসন সংরক্ষণের মতো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
সাধারণ যাত্রীদের সুবিধার জন্য চালু করা ই-টিকিটিং ব্যবস্থায় যদি নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের টিকিট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকে, তাহলে এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল ব্যবস্থার অপব্যবহার টিকিট কালোবাজারির নতুন পথ তৈরি করতে পারে।
তবে সিলেট রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, রেলের টিকিট অনলাইনে কিনতে হয়। কেউ কেউ সরাসরি কাউন্টার থেকেও টিকিট কেনেন। তাঁর বক্তব্য, টিকিট বিক্রিতে স্টেশন কর্তৃপক্ষের কোনো ভূমিকা নেই।
সিলেটের রেল যোগাযোগে নতুন ট্রেন যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’কে ঘিরে। সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট-ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন একটি ট্রেন চালু হবে। মে ও জুন মাসে এ নিয়ে আলোচনা হয়।
কিন্তু ঘোষিত তারিখ পেরিয়ে গেলেও ট্রেনটির চলাচল শুরু হয়নি। চালুর বিষয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগও চোখে পড়েনি। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকেও এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০২৩ সালে অনুমোদন পাওয়া ট্রেনটিকে ঘিরে সিলেটবাসীর প্রত্যাশা ছিল, আধুনিক, ননস্টপ ও আন্তর্জাতিক মানের সেবার মাধ্যমে ঢাকা-সিলেট যাত্রা আরও দ্রুত ও আরামদায়ক হবে। তবে প্রশাসনিক জটিলতা, ইঞ্জিনের স্বল্পতা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ট্রেনটি চালু হয়নি বলে জানা গেছে।
নতুন ট্রেন চালুর উদ্যোগ আটকে থাকার পাশাপাশি বিদ্যমান আন্তনগর ট্রেনগুলোর সেবা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, সিলেট থেকে ঢাকাগামী ট্রেনগুলো পথে আশুগঞ্জ, ভৈরব বাজার ও নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রী ওঠানামার কারণে অতিরিক্ত ভিড়ের মুখে পড়ে। অনেক সময় ট্রেনের ভেতরে চলাচলের জায়গাও থাকে না। ফলে সিলেট থেকে যাত্রা করা যাত্রীদের দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে যেতে হয়।
যাত্রীদের মতে, আন্তনগর ট্রেনের প্রধান আকর্ষণ দ্রুত ও তুলনামূলক আরামদায়ক ভ্রমণ। পথে অতিরিক্ত স্টপেজ ও যাত্রী ওঠানামার কারণে সেই সুবিধা অনেকটাই কমে যাচ্ছে।
সিলেট বিভাগের পর্যটনসম্ভাবনা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা রয়েছে। শ্রীমঙ্গলের রাধানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র। চা-বাগান, লেবু, আনারস ও কাঁঠালের চাষ ঘিরেও স্থানীয় অর্থনীতির বড় অংশ গড়ে উঠেছে। এসব খাতের সঙ্গে যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন শত শত মানুষ।
এ ছাড়া সিলেটের জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লালাখাল, শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল, কমলগঞ্জের হামহাম জলপ্রপাত ও মাধবপুর লেকের মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলোও পর্যটনশিল্প সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে এসব গন্তব্যে যাতায়াত সহজ করতে আধুনিক ও দ্রুত রেল যোগাযোগের সুবিধা এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। পর্যটন খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সিলেট বিভাগের যাত্রীদের জন্য সেই সুবিধা নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
রেলপথের পাশাপাশি সড়কপথেও সিলেটবাসীর স্বস্তি নেই। সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ চলায় বিভিন্ন অংশে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। উন্নয়নকাজের ধীরগতি, ভাঙাচোরা রাস্তা, গর্ত ও অমসৃণ সড়কের কারণে বাস, গাড়ি ও জিপসহ বিভিন্ন যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
ফলে ঢাকা কিংবা দেশের অন্য অঞ্চল থেকে সিলেটে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় পথে কাটাতে হচ্ছে। সড়ক সংস্কার ও নির্মাণকাজের দুর্ভোগের সঙ্গে যানজট মিলিয়ে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে দ্রুত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য রেল যোগাযোগ সিলেটবাসীর কাছে শুধু আরাম-আয়েশের বিষয় নয়; সময় ও অর্থ সাশ্রয়েরও গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
প্রবাসী আয়, চা শিল্প, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পর্যটন সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে সিলেট অঞ্চলের গুরুত্ব রয়েছে। এ অঞ্চলের রেল যোগাযোগ উন্নত হলে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, কর্মসংস্থান ও পণ্য পরিবহনের সুযোগও বাড়তে পারে।
ময়মনসিংহের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হলে দুই অঞ্চলের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক যোগাযোগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা-সিলেট রেলপথে ডাবল লাইন নির্মিত হলে ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু হলে সড়কপথের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
কিন্তু টিকিট ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত, নতুন ট্রেন চালুর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং রেল ও সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে সিলেটের মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ কাটানো কঠিন হবে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









