সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৪ পূর্বাহ্ন

লাল দুর্গাপ্রতিমা দেখতে পাঁচগাঁওয়ে লাখো মানুষের ভিড়

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৮/১০/২০২৬ ০১:৩৬:৩১ অপরাহ্ন

লাল দুর্গাপ্রতিমা দেখতে পাঁচগাঁওয়ে লাখো মানুষের ভিড়


মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে লাল বর্ণের দুর্গাপ্রতিমাকে ঘিরে জমে উঠেছে শারদীয় দুর্গোৎসব। প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ পূজা দেখতে প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে আসেন লক্ষাধিক ভক্ত ও দর্শনার্থী। ব্যতিক্রমী প্রতিমা, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও নানা জনশ্রুতির কারণে পাঁচগাঁওয়ের এই আয়োজন বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি মৌলভীবাজারের পর্যটনেরও গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাধক সর্বানন্দ দাসের হাত ধরে পাঁচগাঁওয়ে লাল বর্ণের প্রতিমায় দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এ আয়োজন এখন বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের পরিচিত দুর্গোৎসবগুলোর একটি। ১৪১৫ বঙ্গাব্দে নতুন স্থানে মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, দেশের অন্য কোথাও এভাবে লাল বর্ণের দুর্গাপ্রতিমার পূজা অনুষ্ঠিত হয় না।

ষষ্ঠী থেকে দশমী পাঁচ দিনজুড়ে এখানে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের উপস্থিতিতে সাধারণত শান্ত গ্রামটি পরিণত হয় উৎসবমুখর জনপদে। মৃৎশিল্পীরা যত্ন ও দক্ষতায় তৈরি করেন লাল বর্ণের দেবীপ্রতিমা। প্রতিমার ব্যতিক্রমী রং ও সাজসজ্জাই এ পূজাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি।

পাঁচগাঁওয়ের দুর্গাপূজার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেবীর আবির্ভাব নিয়ে একটি অলৌকিক কাহিনি। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, সাধক সর্বানন্দ দাস আসামের কামাখ্যায় পূজার জন্য একটি শিশুকন্যা লাভ করেন। পরে ধীরে ধীরে শিশুটির শরীর লাল বর্ণ ধারণ করতে শুরু করে। তখন সাধক উপলব্ধি করেন, শিশুটির মধ্যে স্বয়ং দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে।

কথিত আছে, দেবী সাধককে বর দিতে চাইলে তিনি রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ে দেবীর আবির্ভাব কামনা করেন। জবাবে দেবী জানান, সেখানে তাঁর প্রতিমার রং হবে লাল। সেই বিশ্বাস থেকেই পাঁচগাঁওয়ে লাল বর্ণের প্রতিমায় দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয় বলে স্থানীয়রা মনে করেন।

লোককথায় আরও বলা হয়, একসময় দেবী নিজের উপস্থিতির নিদর্শন হিসেবে একটি কাঁচা ঘরের বেড়ায় পাঁচ আঙুলের লাল ছাপ রেখে যান। একই সঙ্গে রেখে যান স্বর্ণালংকার। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সেই অলংকার এখনো পূজার সময় দেবীর প্রতিমায় পরানো হয়।

পাঁচগাঁওয়ে সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত বিশেষ আয়োজন থাকে। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, ধূপের সুবাস ও পূজার আনুষ্ঠানিকতায় মণ্ডপজুড়ে তৈরি হয় উৎসবের আলাদা আবহ। লাল প্রতিমার দর্শন নিতে আসেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ মনস্কামনা পূরণে, কেউ পরিবারের মঙ্গল কামনায়, আবার কেউ দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের টানে ছুটে আসেন এ গ্রামে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষাধিক ভক্ত ও দর্শনার্থী পাঁচগাঁওয়ের পূজায় অংশ নেন। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বাইরেও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ আসেন। ভারত থেকেও ভক্তদের আগমন ঘটে বলে জানান তাঁরা।

পূজাকে ঘিরে পশুবলি, বস্ত্র ও অলংকার নিবেদনসহ নানা আচার পালন করা হয়। অনেকে মনস্কামনা পূরণের আশায় হোমযজ্ঞ করেন, প্রদীপ ও আগরবাতি জ্বালান। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পূজায় কয়েকটি মহিষ এবং শত শত পাঁঠা, হাঁস ও কবুতর বলি দেওয়ার রীতিও রয়েছে।

পাঁচগাঁও দুর্গাপূজার পরিচালক সঞ্জয় দাস সাধক সর্বানন্দ দাসের ষষ্ঠ উত্তরপুরুষ। তিনি বলেন, তাঁদের পরিবারে ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে লাল বর্ণের প্রতিমায় দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। মূলত এটি পারিবারিক পূজা। দেবীর জাগ্রত উপস্থিতি নিয়ে মানুষের বিশ্বাসের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

সঞ্জয় দাস আরও জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একবার পূজার আনুষ্ঠানিকতায় ব্যত্যয় ঘটে। সে বছর প্রতিমা পূজার পরিবর্তে ঘটপূজা করা হয়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা নিত্য দাস মনে করেন, দুর্গোৎসবের সময় বিপুল মানুষের সমাগম পাঁচগাঁওকে পর্যটনের সম্ভাবনাময় স্থানে পরিণত করেছে। তাঁর মতে, এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবকে মৌলভীবাজারের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

পূজার দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে আয়োজক পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশীদেরও ব্যস্ত থাকতে হয়। আয়োজকেরা জানান, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি তাঁদের। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা করছে। এবারও স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রশাসনের কর্মকর্তারা পূজার আয়োজনের খোঁজখবর নিয়েছেন।

পাঁচগাঁওয়ের ব্যতিক্রমী পূজার পাশাপাশি মৌলভীবাজারের অন্যান্য পূজামণ্ডপেও চলছে শারদীয় দুর্গোৎসবের নানা আয়োজন। জেলা শহরের বেশ কয়েকটি মণ্ডপের প্রবেশপথ সাজানো হয়েছে নান্দনিক নকশায়। আলোকসজ্জা ও দৃষ্টিনন্দন সাজে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।

জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারে এবার সার্বজনীন ৮৯৮টি এবং ব্যক্তিগত ১২৪টিসহ মোট ১ হাজার ২২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

উপজেলাভিত্তিক হিসাবে মৌলভীবাজার সদরে ১১১টি, বড়লেখায় ১৪৬টি, জুড়ীতে ৭৬টি, কুলাউড়ায় ২২৭টি, রাজনগরে ১৩৬টি, কমলগঞ্জে ১৫৪টি এবং শ্রীমঙ্গলে ১৭২টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব চলছে।

জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিটি মণ্ডপে পুলিশ ও আনসানের সমন্বয়ে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর