রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৮ অপরাহ্ন

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে সৌদি আরব?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮/১০/২০২৬ ০১:৪৯:৫০ অপরাহ্ন

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে সৌদি আরব?


সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদের বাইরের প্রাঙ্গণে চুমু খাওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে তাঁদের আটক, বিচার ও সাজা কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা পরিবারের সদস্যদের আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সৌদি আরব আন্তর্জাতিক কনস্যুলার আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। তবে সৌদি আরব সেই ব্যাখ্যা দিতে আইনগতভাবে কতটা বাধ্য, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একই সঙ্গে নিহত দুজনের মরদেহ কোথায় রয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশে ফেরত আনা হবে কি না এবং হলে কী প্রক্রিয়ায় আনা হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিদেশে কোনো নাগরিক আটক হলে তাঁর কনস্যুলার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁদের অভিযোগ, দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে সেই অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে সাবেক এক রাষ্ট্রদূতের মতে, বিদেশি নাগরিকের বিচার ও সাজা কার্যকরের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা সব ক্ষেত্রে নেই।

সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) গত বুধবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কাজে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের আটক করেছিল।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানতে চায়।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, দুই বাংলাদেশির আটক, বিচার ও সাজা কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে থেকে কোনো তথ্য দেয়নি। এমনকি ওই দুজন বাংলাদেশি নাগরিক কি না, তা-ও বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই করা হয়নি বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও সৌদি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত তাঁদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানায়নি। ফলে তাঁদের মরদেহ কোথায় রয়েছে, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে। সাধারণত পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে দূতাবাস প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিহত ব্যক্তির মরদেহ দেশে ফেরত আনতে সহায়তা করে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য না পাওয়ায় সেই প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা স্পষ্ট নয়।

কূটনৈতিক সম্পর্ক ও কনস্যুলার কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ভিয়েনা কনভেনশন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি। ১৯৬১ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন গৃহীত হয়। পরবর্তী সময়ে কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক পৃথক ভিয়েনা কনভেনশনও গৃহীত হয়।

কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশে আটক বা বন্দি ব্যক্তির কনস্যুলার যোগাযোগ ও সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিয়ে বিধান রয়েছে। এ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক আটক হলে তাঁর অনুরোধে সংশ্লিষ্ট দেশের কনস্যুলার কর্তৃপক্ষকে বিলম্ব না করে অবহিত করার কথা বলা হয়েছে। আটক ব্যক্তি চাইলে তাঁর দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ করতে পারেন এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারেন।

সৌদি আরব ও বাংলাদেশ দুই দেশই ভিয়েনা কনভেনশন-সংক্রান্ত চুক্তির সঙ্গে যুক্ত। তবে আটক ব্যক্তিকে অবহিত করা, তাঁর কনস্যুলার অধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে জানানো হয়েছে কি না এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে বর্তমান ঘটনায় আইনি প্রশ্ন উঠেছে।

ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরীফুল হাসানের মতে, পুরো প্রক্রিয়ায় সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে।

তিনি বলেন, কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশি নাগরিক আটক হলে তাঁর দেশের কনস্যুলার বিভাগকে অবহিত করার বিধান রয়েছে। এতে আটক ব্যক্তি তাঁর দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পান।

শরীফুল হাসান আরও বলেন, দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে এসব সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। তাঁর প্রশ্ন, একই ঘটনা যদি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের ক্ষেত্রে ঘটত, তাহলে সৌদি কর্তৃপক্ষ একইভাবে পদক্ষেপ নিত কি না।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, বিদেশে কোনো নাগরিক অপরাধে জড়ালে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী বিচার চলতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট নাগরিকের দেশের দূতাবাসকে জানানো বাধ্যতামূলক এমন বিধান নেই বলে তিনি মনে করেন।

হুমায়ুন কবির বলেন, বিদেশে আটক কোনো নাগরিক কনস্যুলার সুবিধা চাইতে পারেন। তবে নজরুল ও সুইটি আক্তারের ঘটনায় কী ঘটেছিল, তা জানা যায়নি।

তাঁর ভাষ্য, বিচার সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ায় হওয়ায় বাংলাদেশকে জানাতে দেশটির আইনগত বাধ্যবাধকতা ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য চাইলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জবাব দিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, অনেক দেশের কর্তৃপক্ষ বিদেশি নাগরিক আটক হলে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে জানায়। আবার কোনো দেশ নিজের নাগরিকের আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য দিয়ে থাকে। তবে তাঁর মতে, সব ক্ষেত্রে এ ধরনের তথ্য জানানোর আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. রায়হান রশীদের মতে, প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আপিল প্রক্রিয়া শেষে কার্যকর করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি এক দিনে সম্পন্ন হওয়ার কথা নয়।

তিনি বলেন, এমন একটি দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের জানার সুযোগ থাকার কথা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সৌদি কর্তৃপক্ষ তথ্য না দিলে দূতাবাস জানবে না এমন যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মনে করেন।

ড. রায়হান রশীদ আরও বলেন, ভিয়েনা কনভেনশনের বিধান অনুযায়ী আটক ব্যক্তিকে কনস্যুলার সুবিধা নিতে চান কি না, সে বিষয়ে জানানো প্রয়োজন। তিনি সেই সুবিধা নিতে না চাইলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে। তবে এ ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তার প্রমাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা উচিত।

সৌদি আরবে আটক ও মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় অন্য একটি উদাহরণ সামনে এসেছে। দেশটিতে ফেসবুকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে অঞ্জন শিবারাসা নামে শ্রীলঙ্কার এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল সৌদি সুপ্রিম কোর্ট।

তবে দূতাবাসের মাধ্যমে তাঁর পরিবার সাজা মওকুফের আবেদন করার পর গত ১৪ অক্টোবর আদালত সেই রায় বাতিল করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী অরুন হেমাচন্দ্রও এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।

এই ঘটনার সঙ্গে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি তুলনা করে প্রশ্ন উঠেছে, জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাস কেন তাঁদের আটক, বিচার ও সাজা কার্যকরের বিষয়ে কোনো তথ্য পায়নি এবং সৌদি কর্তৃপক্ষই বা কেন দূতাবাসকে অবহিত করেনি।

নজরুল ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাঁদের মরদেহ কোথায় রাখা হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে কি না, পাঠানো হলে কবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এসব প্রশ্নেরও উত্তর পাওয়া যায়নি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে না জানানোয় নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মরদেহ দেশে ফেরানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

শরীফুল হাসানের মতে, বিদেশি নাগরিক হিসেবে ওই দুই বাংলাদেশির কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার ছিল। তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং কনস্যুলার সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে জানানো হয়েছিল কি না, তা-ও এখনো নিশ্চিত নয়।

সব মিলিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সৌদি আরবের আইনি বাধ্যবাধকতা, কনস্যুলার অধিকার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া এবং মরদেহ দেশে ফেরানোর বিষয়গুলো এখনো স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চাওয়া ব্যাখ্যার জবাব পাওয়ার পরই এসব প্রশ্নের আরও পরিষ্কার উত্তর মিলতে পারে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর