হরমুজে আটকে পড়া জাহাজ সরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’
সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ১০:১৩ AM

হরমুজে আটকে পড়া জাহাজ সরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪/০৫/২০২৬ ০৯:০০:৩৩ AM

হরমুজে আটকে পড়া জাহাজ সরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে উপসাগরে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে সোমবার সকালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বের করে আনতে যুক্তরাষ্ট্র ‘পথনির্দেশ’ দেবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে তার প্রতিনিধিদের আলোচনা ‘খুব ইতিবাচকভাবে’ চলছে।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে এই উদ্যোগটি হবে একটি মানবিক পদক্ষেপ, ‘যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং বিশেষ করে ইরানের পক্ষ থেকে’।

তিনি বলেন, ‘আমি আমার প্রতিনিধিদের বলেছি, যেন তারা জানায় আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব তাদের জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপদে প্রণালী থেকে বের করে আনতে। সব ক্ষেত্রেই তারা বলেছে, এলাকা নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত তারা ফিরে আসবে না।’

৮৫০টিরও বেশি জাহাজ কীভাবে মুক্ত করা হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প কোনো বিস্তারিত দেননি।

মার্কিন গণমাধ্যম এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এই পরিকল্পনায় আপাতত মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ দিয়ে সরাসরি এসকর্ট করার বিষয়টি নেই। বরং এটি হবে এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শিপিং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো প্রণালীতে চলাচল সমন্বয় করতে পারবে।

ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হস্তক্ষেপ তেহরান যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখবে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার পরপরই ইরান হরমুজ প্রণালীতে বিদেশি জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপ করে। এর জবাবে ১৩ এপ্রিল ট্রাম্প ইরানি বন্দর ব্যবহারের ওপর পাল্টা অবরোধ দেন।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই রুট দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। এতে গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, শতাধিক আকাশ ও সমুদ্রভিত্তিক বিমান, বহুমাত্রিক ড্রোন প্ল্যাটফর্ম এবং ১৫ হাজার সেনা সদস্য যুক্ত থাকবে।

রোববার ট্রাম্পের এই ঘোষণা আসে ইরানের ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব দেওয়ার প্রায় তিন দিন পর। প্রস্তাবটিতে প্রাথমিকভাবে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ওয়াশিংটনের জবাব পেয়েছে এবং তা পর্যালোচনা করবে।

এই প্রস্তাব ও ট্রাম্পের ঘোষণার সরাসরি সম্পর্ক স্পষ্ট না হলেও, ট্রাম্প বলেন, ‘আমি পুরোপুরি জানি, আমার প্রতিনিধিরা ইরানের সঙ্গে খুব ইতিবাচক আলোচনা করছে, যা সবার জন্য ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে।’

তবে তিনি সতর্ক করে যোগ করেন, ‘এই মানবিক প্রক্রিয়ায় যদি কোনোভাবে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে সেই বাধা শক্তভাবে মোকাবিলা করতে হবে।’

রোববার রাত পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান পাকিস্তানের মাধ্যমে চলছিল, সরাসরি কোনো যোগাযোগের খবর পাওয়া যায়নি।

ট্রাম্পের এই ইতিবাচক সুর তার আগের অবস্থানের তুলনায় বড় ধরনের পরিবর্তন। শনিবার তিনি বলেছিলেন, ইরানের প্রস্তাব পুরোটা পড়েননি এবং এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির তিন সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হরমুজ প্রণালী এখনো পুরোপুরি খোলেনি। গত সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের বেশি উঠে যায়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।

প্রণালী বন্ধ থাকায় প্রায় ২০ হাজার নাবিক বিভিন্ন জাহাজে আটকে পড়েছে, যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ট্রাম্প বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহায়তা চেয়েছে।

এদিকে আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার সম্ভাবনা নিয়েও জল্পনা বাড়ছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা সম্ভাব্য মার্কিন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

অন্যদিকে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে।

যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প কংগ্রেসকে চিঠিতে বলেছেন, শত্রুতামূলক কার্যক্রম ‘শেষ হয়েছে’, যাতে তিনি সামরিক পদক্ষেপে কংগ্রেসের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা এড়াতে পারেন। তবে কয়েক ঘণ্টা পরই তিনি নিজেই বলেন, ‘আপনারা জানেন আমরা যুদ্ধে আছি।’

হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়। প্রণালীটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি অবরোধ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় সংকট তৈরি করেছে।

রোববার যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানায়, প্রণালীর কাছে একটি জাহাজে ছোট নৌযান থেকে হামলা হয়েছে, তবে নাবিকরা নিরাপদ রয়েছে।

ইরানের ১৪ দফা প্রস্তাবে অবরোধ প্রত্যাহার, নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এদিকে লেবাননে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে। ইসরায়েল দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামগুলো থেকে হাজারো মানুষকে সরে যেতে বলেছে এবং ২৪ ঘণ্টায় হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত ও ৪৬ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

ইরানের বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দা শাখা এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ট্রাম্পকে বেছে নিতে হবে—অসম্ভব এক অভিযান, নাকি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে খারাপ একটি চুক্তি।’

জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতিও ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে, বিশেষ করে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর