লাখ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে
সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ১২:৪৮ PM

লাখ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪/০৫/২০২৬ ০৯:০৫:০৯ AM

লাখ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে


ফসল তোলার চাঞ্চল্যে প্রাণময় হয়ে ওঠার কথা ছিল দেশের সাত জেলার হাওরের। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধানের বড় অংশই ডুবে ও ভেসে গেছে। হাওর ও হাওরের কৃষকের জীবন তাই এখন নিস্তরঙ্গ। সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চলে হাহাকার তো আছেই, সেই সঙ্গে বৃষ্টিতে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ারও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগ, পরিবেশ ও কৃষক সংগঠনের হিসাবে এবার হাওরের কমপক্ষে এক লাখ হেক্টর বোরো জমির ফসল তলিয়েছে। ফলে নিঃস্ব হওয়ার পথে রয়েছে দেড় লাখ কৃষক পরিবার। হাওরের ধান মাড়াইয়ের খোলা পানির নিচে। বৃষ্টিপাত শুরুর আগে কাটা ধানের মুড়ি ও মাড়াই করা ধানের স্তূপে অঙ্কুর গাজিয়েছিল, ছড়িয়েছিল পচা গন্ধ।

সেই গন্ধ এখন আরো বেড়েছে। এমন বিপর্যয়ের মধ্যে ফসল শুকানোর জন্য কৃষি বিভাগ থেকে হাওরের সাত জেলায় ১১ হাজার ধান শুকানোর যন্ত্র ড্রায়ার বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম গত বৃহস্পতিবার এ তথ্য দিয়েছিলেন। হাওরের বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল রবিবার পর্যন্ত কোথাও ড্রায়ার পাঠানো হয়নি।

এদিকে চোখের সামনে ফসল নষ্ট হতে দেখে শোকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আলীনগর পশ্চিমপাড়ার কৃষক আক্তার হোসেন (৫৮) গত শনিবার বিকেলে মারা যান। নিহতের পরিবার জানায়, ঋণের ভারে জর্জরিত ছিলেন আক্তার। তাই ফসল হারানোর শোক সইতে পারেননি তিনি। গতকাল অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রশাসন কৃষকের পরিবারের হাতে ২৫ হাজার টাকার অনুদান তুলে দিয়েছে।

অন্যদিকে ধান কাটার শ্রমিকের তীব্র সংকটে দুই চোখে অন্ধকার দেখছেন হাওরের কৃষকরা।

কৃষকরা জানান, বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরুর প্রথম দিকে কৃষকরা ধান কাটার যন্ত্র কম্বাইন হার্ভেস্টার হাতের কাছে পাননি। কিছু যন্ত্র হাওরে পৌঁছালেও প্রভাবশালী চক্র বড় কৃষকদের কেবল এ সুবিধা দিয়েছে। গত শুক্রবার কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল নিকলীর ক্ষতিগ্রস্ত হাওর পরিদর্শনে গেলে কৃষকরা তাঁর কাছে এ অভিযোগ করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধান কাটার শ্রমিকদের হাওরে আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। কিশোরগঞ্জের নিকলী, বাজিতপুর, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন ও ইটনার বেশ কয়েকজন কৃষক জানান, পর্যাপ্ত কৃষি শ্রমিক পাওয়া গেলে ক্ষতি আরো কম হতো।

কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরে ধান তোলার কাজ তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত খামারবাড়ির উপপরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম জানান, পানি বাড়ায় হাওরে ধান কাটার যন্ত্র নামানো যাচ্ছে না। বজ্রপাতের ভয়ে শ্রমিকরাও ধান কাটতে হাওরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। বৃষ্টিপাতে হাওরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, আবহাওয়া ভালো হলে কৃষকরা কিছুটা হলেও রক্ষা পেতেন।

নেত্রকোনার দায়িত্ব পাওয়া উপপরিচালক এ এইচ এম জাহাঙ্গীর আলম জানান, বৃষ্টি বাড়তে থাকায় পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির ধান আর কাটা সম্ভব হচ্ছে না। এ সময় ক্ষতি কমানোর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কৃষকের জন্য এখন আর তেমন কিছু করার নেই। এ দুই কৃষি কর্মকর্তাই কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, হাওরে ড্রায়ার পাঠানো হয়নি। এ বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেনও না।

কৃষকরা জানান, কৃষি বিভাগের সরবরাহ করা কম্বাইন হার্ভেস্টার যন্ত্র কোমরসমান পানিতেও নামানো যাবে না। ধান কাটার শ্রমিকরাও এ সুযোগে দিনপ্রতি মজুরি দেড় হাজার টাকা হাঁকছেন। কিন্তু চড়া দামে শ্রমিক নিযুক্ত করার মতো শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। কিশোরগঞ্জের ইটনার মৃগা গ্রামের কৃষক আমরুল ইসলাম জানান, তাঁর চাষ করা ৩০ একর জমির মধ্যে বৃষ্টির আগে ১০ একরের ধান কাটতে পেরেছেন। বাকি ২০ একর কোমরসমান পানির নিচে তলিয়ে আছে।

কম্বাইন হার্ভেস্টার পেলে আরো কয়েক একর জমির ফসল তুলতে পারতেন। তাঁর এলাকায় শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে পানির নিচে তাঁর ৮০০ মণ ধান পড়ে আছে। এতে তিনি কমপক্ষে আট লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান জানান, গতকাল পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ জেলায় ১০ হাজার ৫০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়েছে। তিনি জানান, গেল সপ্তাহে বাইরের জেলাগুলো থেকে হাওরে শ্রমিক পাঠানোর জন্য তিনি চিঠি দিয়েছিলেন। এখনো হাওরে ড্রায়ার বা শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

আবহাওয়া আরো খারাপ হলে ক্ষয়ক্ষতি আরো বাড়বে বলে মন্তব্য করে এ কৃষিবিদ আরো জানান, ফসল হারানোর শোকে মারা যাওয়া অষ্টগ্রামের কৃষক আক্তার হোসেনের পরিবারের পাশে উপজেলা ও কৃষি প্রশাসন দাঁড়িয়েছে।

সুনামগঞ্জে ধান কাটার মনগড়া প্রতিবেদন

ক্ষয়ক্ষতি ও ধান কাটা নিয়ে কৃষি বিভাগে মনগড়া প্রতিবেদন দিয়েছে। ২৫ থেকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে সুনামগঞ্জে সব হাওরে অবশিষ্ট পাকা ধান ডুবে যায়। এই সময় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ধান কাটা প্রায় থমকে ছিল। বিশেষ করে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল ছিল ভারি বর্ষণ আর বজ্রপাত। এই সময় হাওরে নামতে পারেননি কৃষক। ক্ষতিও এই সময়ই বেশি হয়। কিন্তু কৃষি বিভাগের ধান কাটা ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পর্যবেক্ষণ করে আজগুবি তথ্য দেখা গেছে। এই সময় যেখানে ২৫ এপ্রিল হাওরে ধান কাটার হার ছিল ৩৬.৯০ শতাংশ, সেখানে ২৬ এপ্রিল দুর্যোগের দিন তা হয়ে গেছে ৪৫.৩২ শতাংশ।

তবে কৃষকরা জানিয়েছেন ২৬ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ভয়ে কৃষকরা হাওরে নামেননি। ফসলও ডুবে গিয়েছিল। তাই কৃষি বিভাগের প্রতিবেদন মনগড়া। সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের শিয়ালমারার কৃষক হেলেনা খাতুন বলেন, চার-পাঁচ দিন কেউ ক্ষেতে নামতে পারেনি।  বৃষ্টি কমলেও আর ধান কাটার মতো অবস্থা নেই। সব ধান পানিতে ডুবে গেছে। আমার ছয় কেয়ারের চার কেয়ার ডুবে গেছে।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনেন সহসভাপতি শাহ কামাল বলেন, অর্ধেকের বেশি ধান ২৭ থেকে ২৯ এপ্রিলের মধ্যে ডুবে নষ্ট হয়েছে। এই দুর্যোগের দিনে ভয়ে হাওরে নামেননি কৃষকরা। কিন্তু কৃষি বিভাগ মনগড়া প্রতিবেদনে বাড়িয়েছে ধান কাটার পরিমাণ। এ সময় ক্ষতি বাড়লেও তাদের প্রতিবেদনে ক্ষতির পরিমাণও কম দেখানো হয়েছে। এই মনগড়া প্রতিবেদনের মাধ্যমে কৃষকদের সঙ্গে তামাশা করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপরিচালক মো. ওমর ফারুক ২৫ এপ্রিলের পর থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বিরূপ আবহাওয়া থাকলেও ধান কাটার পরিমাণ কিভাবে বাড়ল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়ন পর্যায়ের অফিসাররা মাঠে গিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছেন। আমাদের রিপোর্ট সত্য। তবে কৃষকের ডুবে যাওয়া ও কাটা ধান পচে নষ্ট হয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, এক সপ্তাহ পরে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যাবে। 

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর