একটি সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একজন তরুণের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, মুহূর্তেই নিভিয়ে দিয়েছে একটি অসহায় পরিবারের শেষ আশার আলো। সিলেটের ওসমানীনগরে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় নিহতদের একজন সপ্তম রায় প্রীতম। বয়স মাত্র ২২। সিলেট মহানগরীর সোবহানিঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে তিনি।
প্রীতম ছিলেন তার বৃদ্ধ মা ও বোনের একমাত্র অবলম্বন। ছোটবেলায় পানিতে ডুবে হারিয়েছিলেন একমাত্র ভাইকে। সেই শোকের পর সংসারের হাল ধরেছিলেন নিজের কাঁধে। বয়সের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল দায়িত্ব। নিজের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষাকে পেছনে ফেলে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য।
কিন্তু শুক্রবারের একটি যাত্রা সবকিছু শেষ করে দিল। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সিলেট থেকে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল স্লিপার কোচের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় ওসমানীনগরে। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সাতজন। গুরুতর আহত আরও দুজনকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁদেরও মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে ঝরে যায় নয়টি প্রাণ। হাসপাতালের শয্যায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১৪ জন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। কিন্তু এই নয়টি মৃত্যুর মধ্যে প্রীতমের মৃত্যু যেন আলাদা এক শূন্যতা রেখে গেল সোবহানিঘাটের একটি পরিবারে।
কে জানত, রাজধানীর উদ্দেশে বের হওয়া সেই পথই হবে প্রীতমের জীবনের শেষ যাত্রা! যে তরুণটি প্রতিদিন পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন, বৃদ্ধ মা ও বোনের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিরলস পরিশ্রম করতেন, সেই তরুণই আজ নেই।
প্রীতমের খালাতো বোনের জামাই কাজল ভৌমিক বলেন, প্রীতমই ছিল পরিবারের একমাত্র ভরসা। তার উপার্জনের ওপর নির্ভর করেই চলত বৃদ্ধ মা ও বোনের সংসার। অনেক অভাব অনটনের মধ্যেও সে কখনো দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ায়নি। ছোটবেলায় পানিতে ডুবে তার একমাত্র ভাই মারা যাওয়ার পর থেকেই সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। আজ সেই প্রীতমও আমাদের ছেড়ে চলে গেল।
প্রতিবেশী নরেন ভট্টাচার্য্য বলেন, নিহতদের তালিকায় সপ্তমের নাম দেখে হৃদয় ভেঙে গেছে। ছোটবেলা থেকে তাকে কোলে পিঠে করে বড় হতে দেখেছি। তারা আমাদের পাশের বাসার ভাড়াটিয়া ছিল। এর আগে পানিতে ডুবে তার একমাত্র ভাই মারা গিয়েছিল। এখন এই শোক তার বৃদ্ধ মা ও বোন কীভাবে সইবেন, সেটাই ভাবছি। খবরটি শোনার পর থেকেই খুব খারাপ লাগছে।
সোবহানিঘাট এলাকার স্থানীয়রা জানান, পরিবারের জন্য নিরলস পরিশ্রম করা প্রীতমের অকাল মৃত্যু স্বজনদের নয়, পুরো এলাকার মানুষের মনকেও ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। একের পর এক পারিবারিক বিপর্যয়ের পর এবার পরিবারের শেষ অবলম্বনকেও হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তার মা ও বোন।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









