সিলেটে সড়কে মৃত্যুর মিছিল
শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৩৩ PM

সিলেটে সড়কে মৃত্যুর মিছিল

সম্পাদকীয়

প্রকাশিত: ০৮/০৮/২০২৬ ১০:২৬:১০ AM

সিলেটে সড়কে মৃত্যুর মিছিল


সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—সিলেটের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক ভয়াবহ বাস্তবতা। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনার খবর আসে। কখনো বাস-মাইক্রোবাসের সংঘর্ষ, কখনো ট্রাকের চাপায় প্রাণহানি, আবার কখনো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিভে যায় তরুণ প্রাণ।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দুর্ঘটনার খবর প্রকাশের পর কয়েকদিন আলোচনা হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ দৃশ্যমান হয় না। ফলে এক দুর্ঘটনার শোক কাটতে না কাটতেই সামনে আসে আরেকটি প্রাণহানির খবর।

পরিসংখ্যানও সেই বাস্তবতারই নির্মম চিত্র তুলে ধরছে। নিরাপদ সড়ক চাই—নিসচা সিলেট বিভাগীয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সিলেট বিভাগে ৩৫৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৮৭২ জন। অর্থাৎ গড়ে মাসে প্রায় ৩০ জনের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৩২ জনই মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী।

এই হিসাবের অর্থ খুব সহজ—প্রতিদিন গড়ে প্রায় একজন মানুষ সিলেট বিভাগের সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন।এটি কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন উপার্জনক্ষম মানুষ, একজন শিক্ষার্থী, একজন শ্রমিক, একজন চালক কিংবা কোনো স্বপ্নবাজ তরুণের জীবন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৬ সালেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। শুধু মে মাসেই নিসচার হিসাবে সিলেট বিভাগে ৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫১ জন নিহত ও ৬৫ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২০ জন ছিলেন মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী।

সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ থাকে না। চালকের বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, সড়কের নকশাগত ত্রুটি, অপর্যাপ্ত সড়কবাতি, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পথচারীদের অসচেতনতা—সব মিলিয়েই তৈরি হয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি। সিলেটের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু বাস্তবতা।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এই অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগের লাইফলাইন। প্রতিদিন অসংখ্য বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যান, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি এই পথে চলাচল করে। মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ধীরগতির যানবাহন ও দ্রুতগতির যানবাহনের পাশাপাশি চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।

শুক্রবার সকালেও ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর এলাকায় দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নয়জনের প্রাণহানির ঘটনাও আবার সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে—একটি মহাসড়কে এত প্রাণহানি ঘটার পরও আমরা কেন প্রতিবার দুর্ঘটনার পর শুধু শোক প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থাকি?

সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলেই সাধারণত চালককে দায়ী করার প্রবণতা দেখা যায়। চালকের দায়িত্ব অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু একটি দুর্ঘটনার পেছনে যদি সড়কের অবস্থা, যানবাহনের ফিটনেস, চালকের কর্মঘণ্টা, প্রশিক্ষণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা থাকে, তাহলে শুধু চালককে দায়ী করে সমস্যার মূল জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব নয়। সড়ক নিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।

চালকের লাইসেন্স আছে কি না, যানবাহনের ফিটনেস ঠিক আছে কি না, চালক কত ঘণ্টা ধরে গাড়ি চালাচ্ছেন, সড়কের কোথায় ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক বা মোড় রয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আছে কি না—সবকিছু নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

সিলেট বিভাগের চার জেলা—সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ—ভৌগোলিকভাবে একরকম নয়। কোথাও পাহাড়ি ও আঁকাবাঁকা সড়ক, কোথাও হাওরাঞ্চল, কোথাও ব্যস্ত মহাসড়ক, আবার কোথাও শহরকেন্দ্রিক যানজট। তাই পুরো বিভাগের জন্য একই ধরনের ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।

ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে ‘ব্ল্যাক স্পট’ ভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন স্থানে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে, কোন সময়ে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে, কোন ধরনের যানবাহন বেশি জড়িত এবং দুর্ঘটনার প্রধান কারণ কী—এসব তথ্য নিয়ে নিয়মিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সড়ক নিরাপত্তা পরিকল্পনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, দুর্ঘটনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়াভিত্তিক নয়।

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়। পরিবহন মালিক, চালক, বিআরটিএ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধি—সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। পরিবহন মালিকদের নিশ্চিত করতে হবে প্রশিক্ষিত ও বৈধ লাইসেন্সধারী চালক। যানবাহনের ফিটনেস নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্ব হলো নিয়মিত পরিদর্শন, আইন প্রয়োগ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। আইন প্রয়োগ যদি শুধু বিশেষ অভিযান বা দুর্ঘটনার পর কয়েকদিনের তৎপরতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

দুর্ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতালে দ্রুত পৌঁছানো, অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা, মহাসড়কের পাশে জরুরি চিকিৎসা সুবিধা এবং ট্রমা সেবার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে অনেক গুরুতর আহত মানুষকে বাঁচানো সম্ভব।

সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়টি এখন নতুন করে ভাবতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনার পর আমরা সাধারণত লিখি—‘মর্মান্তিক দুর্ঘটনা’, ‘নিহত এতজন’, ‘আহত এতজন’। এরপর কয়েকদিন পর ঘটনাটি মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। কিন্তু পরিসংখ্যানের কাজ শুধু সংবাদ তৈরি করা নয়; পরিসংখ্যান থেকে নীতি তৈরি হওয়া উচিত।

২০২৫ সালে ৩৫৬টি দুর্ঘটনায় ৩৬৪ জনের মৃত্যু এবং ৮৭২ জনের আহত হওয়ার তথ্য যদি আমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য যথেষ্ট সতর্কবার্তা না হয়, তাহলে আর কত প্রাণহানি প্রয়োজন?

আর ২০২৬ সালের মে মাসে এক মাসেই ৫১ জনের মৃত্যু আমাদের সামনে আরও একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে—**আমরা কি সড়ক নিরাপত্তাকে সত্যিই অগ্রাধিকার দিচ্ছি?

সিলেটের সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে কয়েকটি বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে গুরুত্ব দেওয়া দরকার—

প্রথমত, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অদক্ষ চালকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে।

তৃতীয়ত, মোটরসাইকেল চালকদের জন্য হেলমেট ও নিরাপদ গতি নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে।

চতুর্থত, মহাসড়কে অবৈধ পার্কিং, বিপজ্জনক ইউটার্ন এবং ধীরগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধ করতে হবে।

পঞ্চমত, চালকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামহীনভাবে গাড়ি চালানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

ষষ্ঠত, দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে মহাসড়কভিত্তিক জরুরি সেবা জোরদার করতে হবে।

সপ্তমত, দুর্ঘটনার প্রতিটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে কারণভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—সড়ক নিরাপত্তাকে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সিলেটের সড়কে প্রতিদিন যে প্রাণহানি ঘটছে, তা কোনো স্বাভাবিক বাস্তবতা হতে পারে না। ২০২৫ সালের ৩৬৪ মৃত্যু এবং ২০২৬ সালের মে মাসের ৫১ মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রচলিত ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।

আমরা দুর্ঘটনার পর স্বজনদের আহাজারি দেখতে চাই না। দেখতে চাই না হাসপাতালের মর্গে একের পর এক মরদেহ। চাই না আর কোনো মা তার সন্তানকে হারান, কোনো সন্তান তার বাবাকে হারায়, কোনো পরিবার এক মুহূর্তে তার একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারায়।

সড়ক উন্নয়ন মানেই শুধু প্রশস্ত সড়ক নয়; সেই সড়কে মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অংশ।

সিলেটের সড়ক হতে হবে দ্রুতগতির পাশাপাশি নিরাপদ। আর সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নয়, দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধ। কারণ প্রতিটি সংখ্যা একজন মানুষ। আর প্রতিটি প্রাণহানি—একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি।

সম্পাদকীয়

সিলেটজুড়ে


মহানগর