মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকা এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার মধ্যে আজ চলতি বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটানো ও ব্যাংকঋণের প্রবাহ বাড়ানোর বিষয়টি এবারের নীতিতে গুরুত্ব পেতে পারে।
বুধবার বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যান্য ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান কর্মকর্তা, গবেষণা বিভাগের নির্বাহী পরিচালক, মুখপাত্র ও সহকারী মুখপাত্রসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলনে থাকবেন।
বর্তমানে অর্থনীতির সামনে একই সঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে কমে যাওয়া বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে গতি ফেরানো। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, গত আগস্টে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। এটি গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হলেও মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। এর আগে জুলাইয়ে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ পুরোপুরি কাটেনি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। জুনে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ছিল সর্বনিম্ন। অথচ চলতি বছরের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ সুদহারের কারণে ঋণের চাহিদা কমেছে। ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহের কারণে সেই অর্থ প্রত্যাশিত হারে উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না। বিশেষ করে শিল্প, নির্মাণ ও পরিবহন খাতে নতুন ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থের জোগান থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে কাঙ্ক্ষিত গতি দেখা যাচ্ছে না।
বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে গত ২ আগস্ট নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণের ব্যয় কমিয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনার লক্ষ্যেই ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে নীতি সুদহার কমানোর পরও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ ছাড়াতে পারেনি।
এ অবস্থায় নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে গিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা যাতে ব্যাহত না হয়, সেই ভারসাম্য রক্ষা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে বছরে দুইবার মুদ্রানীতি ঘোষণার পরিবর্তে আরও ঘন ঘন নীতি পর্যালোচনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি সংসদীয় কমিটিতে বছরে চারবার মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতির পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হলে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতিগত সিদ্ধান্তেও দ্রুত পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি করাই এ প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য।
নিয়মিত বিরতিতে মুদ্রানীতি পর্যালোচনা করা হলে মূল্যস্ফীতি, ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং খাতের তারল্যের পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
অর্থনীতিতে অর্থের সরবরাহ ও সুদের হারের ওপর প্রভাব রাখার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার মুদ্রানীতি। তাই আজকের ঘোষণায় মূল্যস্ফীতি মোকাবিলার কৌশলের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক কী ধরনের দিকনির্দেশনা দেয়, তা এখন দেখার বিষয়।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
অর্থনীতি ডেস্ক 








