মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৫ অপরাহ্ন

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ-ভাঙচুর-আগুন

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩/১১/২০২৬ ১০:৩৪:৪৩ পূর্বাহ্ন

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ-ভাঙচুর-আগুন


ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে, কোথাও যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েক শ পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হলেও আন্দোলন থামেনি। বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।

শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে সোমবার সচিবালয়ে পোশাক কারখানার মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বৈঠক শেষে সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনে কিছু শিল্পমালিক ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়। অন্যদিকে শ্রমিক নেতাদের কেউ কেউ দাবি করেন, শ্রমিক পরিচয়ে কিছু ব্যক্তি বাইরে থেকে আন্দোলনে ইন্ধন দিচ্ছেন।

এর আগে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে রোববার (১ নভেম্বর) সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করে। ওই রাতেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তিনি নির্দেশনা দেন। সরকার শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে সরে এসে কাজে ফেরার আহ্বান জানালেও সোমবার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে।

রোববারের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের পর সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীর মিরপুর এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশের সতর্ক অবস্থান দেখা যায়। মিরপুর-১০, পল্লবী ও কাফরুলসহ কয়েকটি এলাকায় ছোট ছোট দলে শ্রমিকদের জড়ো হতে দেখা যায়।

সকাল সোয়া ৯টার দিকে শ্রমিকরা মিরপুর-১০ এলাকায় সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকজন বিক্ষোভকারীসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়।

একই সময় মিরপুর-১১ ও ১২ নম্বর এলাকায় শ্রমিকরা সড়কে জড়ো হলে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেয়। শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রতিবাদে মিরপুরের সড়কে মিছিল করেন ক্ষমতাসীন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মহিদুল ইসলাম জানান, রোববার মিরপুরে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় সোমবার পর্যন্ত অন্তত ২৯ জনকে আটক করা হয়েছে। রোববার রাত থেকে সোমবার পর্যন্ত আটক ব্যক্তিদের এই হিসাব বলে জানান তিনি।

ঢাকার বাইরে গাজীপুরেও শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার সকাল থেকে শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে কয়েক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। বিকেলে গাজীপুর শিল্প পুলিশের সুপার আমজাদ হোসেন জানান, সকাল থেকে বিক্ষোভ চললেও বিকেল নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে।

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গাজীপুর অঞ্চলের প্রায় দেড় শ পোশাক কারখানায় সোমবার ছুটি ঘোষণা করা হয়।

নারায়ণগঞ্জেও সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। সোমবার দুপুরে তাঁরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় অবস্থান নিলে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। প্রায় চার ঘণ্টা অবরোধের পর পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল আবার শুরু হয়।

এদিকে আশুলিয়ায় শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুর-১১ এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানার প্রধান ফটকে তালা দেখা যায়। কারখানার বাইরে টানানো ছুটির নোটিশে লেখা ছিল, ‘আজ দোসরা নভেম্বর ২০২৬ তারিখে অনিবার্য কারণবশত ফ্যাক্টরি ছুটি ঘোষণা করা হলো।’

কারখানার গেটে দায়িত্ব পালনকারীদের কয়েকজন জানান, রোববারের সহিংসতার পর সোমবার কর্তৃপক্ষ কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করেছে। তবে ছুটি ঘোষণার পরও কয়েকটি কারখানার আশপাশে সকালে শ্রমিকদের জড়ো হতে দেখা যায়। পুলিশের টহল এবং বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিলের পর তাঁদের অনেককে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে দেখা যায়।

মিরপুর, পল্লবী ও কাফরুল এলাকার অনেক কারখানা বন্ধ থাকলেও কল্যাণপুরের কয়েকটি পোশাক কারখানা চালু ছিল। সেখানে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক দেখা যায়।

রোববার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠকের পর সোমবার সকালে সচিবালয়ে পোশাক কারখানার মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ সরকারের কয়েকজন প্রতিনিধি।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় থাকা কিছু শিল্পমালিক এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কেউ কেউ শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে কাজ করছেন বলে সরকারের কাছে তথ্য ও প্রমাণ রয়েছে।

ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠনের আলোচনার মধ্যেই যারা অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, তাঁদের পেছনে কারা ইন্ধন দিচ্ছেন, তা চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে যারা স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর দুপুরে সরকারের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন শ্রমিক নেতা ও মজুরি বোর্ডের সদস্য বাবুল আখতার।

তিনি দাবি করেন, শ্রমিক পরিচয়ে কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছেন। তাঁদের ইন্ধনেই শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শ্রমিকদের উদ্দেশে বাবুল আখতার বলেন, সবাই যেন কাজে ফিরে যান এবং কারও প্ররোচনায় পা না দেন। বিপদে পড়লে শ্রমিক ফেডারেশন তাঁদের পাশে থাকবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

বৈঠকে শ্রমিক প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পোশাক কারখানাগুলোতে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন না থাকায় আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এই সুযোগে তৃতীয় পক্ষ পরিস্থিতির ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে তাঁদের দাবি।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর