২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। এর মাত্র আগের দিন ১৮ জুলাই পুলিশের নিজেকে আত্মরক্ষা করতে গিয়ে পানিতে ডুবে শহীদ হন শাবিপ্রবির কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও পলিমার সায়েন্সেস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রুদ্র সেন। আর আজকের দিনে অর্থাৎ ১৯ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শহীদ রুদ্র সেনের ময়নাতন্ত সম্পন্ন হয়। সকালে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েন শাবিপ্রবির তৎক্ষালিন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদ। শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে মেডিকেল কলেজের বিকল্প পথে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হন তৎক্ষালিন উপাচার্য। তবে অন্যান্য শিক্ষকরা বেশ কিছুক্ষণ শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন।
এই দিন জুম্মার নামাজের পর বেলা ১টা ৫০ মিনিটের দিকে নগরীর বন্দরবাজার এলাকায় আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে একাত্মতাপোষন করে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিক্ষোভ মিছিল বের করে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
কালেক্টরেট মসজিদ থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে জিন্দাবাজার অভিমূখে রওয়ানা দেয়ার পরই হঠাৎ করে কোন প্রকার উস্কানী ছাড়াই মিছিলে গুলি করা শুরু করে পুলিশ। সংঘাতের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পেশাগত দায়িত্বরত অবস্থায় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার সিলেট ব্যুরো প্রধান এটিএম তুরাব। পুলিশ হামলা শুরু করার পর বিএনপির নেতাকর্মীরাও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। পুলিশের সাথে শুরু হয় সংঘর্ষ। একদিকে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পুলিশ অন্যদিকে নিরস্ত্র বিএনপি, তবুও তারা নিজেদের সাধ্যমত শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে গেছেন। এসময় পুলিশের হামলায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের অন্তত ৪০ জন নেতাকর্মী আহত হন।
সাংবাদিক এটিএম তুরাবকে গুলিবৃদ্ধ অবস্থায় প্রথমে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে একটি বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
এদিকে, সাংবাদিক এটিএম তুরাবের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সিলেটের সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাতেই কয়েকজন সাংবাদিক নেতা কর্মসূচি দিতে চাইলেও পরে অজ্ঞাত কারনে তা আটকা পড়ে।
এর আগে এদিন দুপুর থেকেই সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের আখালিয়া এলাকায় অবরোধ সৃষ্টি করে রাখেন সাধারণ শিক্ষার্থী সহ মুক্তিকামী জনতা। বিকেল ৪টা থেকে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ অবরোধকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে রাত ১০টার দিকে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয় অবরোধকারীদের।
এ সময় মুহূর্মুহূ সাউন্ড গ্রেনেড, শটগান ও রাবার বুলেটের শব্দ পাওয়া যায় মদিনা মার্কেট থেকে আখালিয়া এলাকায়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংঘর্ষে আন্দোলনকারী ছাত্রজনতা ও সাধারণ মানুষ অন্তত শতাধিক আহত হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবুও পিছিয়ে যান নি আন্দোলনকারীরা, তারা লড়াইকে তীব্র থেকে আরো তীব্রতর করে তোলেন। সবার চোখে মুখে ছিল গোলামীর জিঞ্জির থেকে মুক্তির স্বপ্ন, একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। রাতে ১১টার পরে সিলেটে ব্যাপক বৃষ্টি শুরু হলে সংঘর্ষের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এদিকে, ইতিমধ্যেই বিজিবি, র্যাব, পুলিশ দিয়ে ও ইন্টারনেট বন্ধ করেও আন্দোলন থামাতে কার্যত ব্যর্থ হলে তৎক্ষালিন সরকার আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ নিজেদের সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের স্বসস্ত্র ক্যাডারদের মাঠে নামিয়েও কাজ হয়নি। আর ইতিমধ্যেই আন্দোলন করতে গিয়ে ৬৭৩ জন শহীদ এবং প্রায় ২১ হাজার শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী আহত হন। অবস্থা বেগতিক দেখে নিজেদের ক্ষমতা আকড়ে রাখতে কারভিউয়ের মতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় সরকার।
দিনভর এমন আন্দোলনের পর রাত ১১টার দিকে খবর আসে সারাদেশে কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনা মোতায়েনের ঘোষণাও দেয়া হয়। শুরু হয় নতুন উৎকণ্ঠার।
আজকের সিলেট/এসটি
নিজস্ব প্রতিবেদক 








