নিপাহ ভাইরাস একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রাণঘাতী রোগ। এ ভাইরাস সরাসরি মস্তিষ্কে (এনসেফালাইটিস) কিংবা শ্বাসতন্ত্রে আক্রমণ করে, যা দ্রুত মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। কার্যকর কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট ওষুধও আবিষ্কৃত হয়নি; আক্রান্তদের কেবল উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ অবস্থার মধ্যেই বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এক নারীর মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। শুক্রবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশের উত্তরাঞ্চলের ওই নারী নিপাহ ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে মারা যান।
ডব্লিউএইচও জানায়, বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। সাম্প্রতিক এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেশী ভারতেও দুটি নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। এর জেরে এশিয়ার কয়েকটি দেশের বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ওই নারীর বয়স ছিল ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। তিনি গত ২১ জানুয়ারি নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথমে জ্বর ও মাথাব্যথা দেখা দিলেও পরে তার শরীরে অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, দিকভ্রান্তি ও খিঁচুনিসহ গুরুতর উপসর্গ দেখা দেয়। অসুস্থ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর একদিন পর পরীক্ষার মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
ডব্লিউএইচও জানায়, ওই নারীর সাম্প্রতিক কোনো ভ্রমণ ইতিহাস পাওয়া যায়নি। তবে তিনি কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় তার সংস্পর্শে আসা ৩৫ জন ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। তাদের সবার পরীক্ষার ফল নিপাহ ভাইরাসের জন্য নেগেটিভ এসেছে এবং এখন পর্যন্ত নতুন কোনো সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপাহ ভাইরাস সাধারণত বাদুড় দ্বারা দূষিত ফল বা খাদ্যপণ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে মানুষে মানুষে এটি সহজে ছড়ায় না, অর্থাৎ এটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নয়।
এদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ তাদের বিমানবন্দরে তাপমাত্রা পরীক্ষা চালু করেছে।
ডব্লিউএইচও বলেছে, বর্তমান তথ্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিকভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ কারণে কোনো ধরনের ভ্রমণ বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করা হয়নি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে চারটি পরীক্ষাগারে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুর ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। বর্তমানে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অনুমোদিত ওষুধ বা টিকা নেই।
উল্লেখ্য, এই রোগটি ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রথম দেখা যায়। সুঙ্গাই নিপাহ নামক মালয়েশিয়ার একটি গ্রামের নামে এই রোগের নামকরণ করা হয়। সেই সময় এই রোগ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য লাখ লাখ শূকরকে মেরে ফেলা হয়।
সংক্রমণের সাধারণত ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়। তীব্র জ্বর এবং মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, বমি ভাব এবং গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও কাশি হতে পারে।
মারাত্মক পর্যায়ে মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), যার ফলে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া বা খিঁচুনি হতে পারে।
যারা এ রোগ থেকে সুস্থ হন, তাদের অনেকের মধ্যে পরবর্তী সময়ে খিঁচুনি বা মানসিক পরিবর্তনের মতো স্নায়বিক সমস্যা থেকে যেতে পারে।
কোনোভাবেই কাঁচা খেজুরের রস পান করবেন না। প্রয়োজনে রস ফুটিয়ে খেতে পারেন। যে কোনো ফল খাওয়ার আগে ভালো করে ধুয়ে নিন এবং খোসা ছাড়িয়ে খান। বাদুড় বা পাখির আধখাওয়া ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন।
আজকের সিলেট/এপি
স্বাস্থ্য ডেস্ক 








