হবিগঞ্জের মাধবপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জগদীশপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বর থেকে জাতীয় চার নেতার ছবিসংবলিত ম্যুরাল সরিয়ে ফেলার ঘটনায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। প্রায় তিন মাস আগে চত্বর সংস্কারের সময় ম্যুরালটি অপসারণ করা হলেও কার নির্দেশ বা সিদ্ধান্তে এটি সরানো হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের বক্তব্যেও পাওয়া যাচ্ছে না পরিষ্কার কোনো তথ্য। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের সিদ্ধান্তে ম্যুরালটি সরানো হয়নি। অন্যদিকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারাও এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু জানেন না। ফলে ম্যুরাল অপসারণের কারণ ও এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
জগদীশপুর মুক্তিযোদ্ধা গোলচত্বরে প্রায় ১০ বছর আগে সরকারি উদ্যোগে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানের ছবিসংবলিত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল। জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেখানে উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধারা শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী জাতীয় চার নেতার স্মৃতি সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। তাই তাদের ছবিসংবলিত ম্যুরাল অপসারণের ঘটনাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না তারা।
মাধবপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বলেন, জাতীয় চার নেতা মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। আগের সরকার সরকারি উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধা চত্বর এলাকায় তাদের ম্যুরাল স্থাপন করেছিল। তবে সেটি বর্তমান সরকারের নির্দেশে সরানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন। এ ধরনের কাজকে তারা সমর্থন করেন না বলেও জানান তিনি।
ম্যুরাল অপসারণের বিষয়ে মাধবপুরের তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), বর্তমানে বিশ্বনাথ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জাহিদ বিন কাসেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি মুক্তিযোদ্ধারা ভালো বলতে পারবেন। ম্যুরাল সরানোর বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না বলেও জানান। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা নেতাদের সংশ্লিষ্টতার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন।
এ বিষয়ে ভিন্ন একটি তথ্য দিয়েছেন মাধবপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা জারু মিয়া। তিনি বলেন, গত ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া দিবসের অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আযম খান মুক্তিযোদ্ধা চত্বরের বেহাল অবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর সেখানে সংস্কারকাজ শুরু হয়।
জারু মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাতীয় চার নেতার পরিবর্তে ১১ জন সেক্টর কমান্ডারের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীর নাম ও ছবি সংযুক্ত করে নতুন ম্যুরাল নির্মাণ করা হবে বলে স্থানীয়ভাবে শোনা যাচ্ছে।
তবে বর্তমান মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, প্রশাসনের সিদ্ধান্তে আগের ম্যুরালটি অপসারণ করা হয়নি। এমনকি নতুন ম্যুরাল নির্মাণের বিষয়েও উপজেলা প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
এ অবস্থায় ম্যুরাল অপসারণ নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। কারণ উপজেলা প্রশাসন এ বিষয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তের কথা অস্বীকার করছে, আবার স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারাও বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত নন। তৎকালীন ইউএনওর বক্তব্যেও ম্যুরাল অপসারণের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
জাতীয় চার নেতার অন্যতম এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজও ম্যুরাল অপসারণের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের দাবি, জাতীয় চার নেতার ছবিসংবলিত ম্যুরালটি কেন সরানো হয়েছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় চার নেতার স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি 








