জিয়া পরিবারের প্রতিই মানুষের আস্থা
বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩০ PM

জিয়া পরিবারের প্রতিই মানুষের আস্থা

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২/০৯/২০২৬ ০৯:২১:৫৪ AM

জিয়া পরিবারের প্রতিই মানুষের আস্থা


বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতা উল্টালে একটি পরিবারের নাম অবধারিতভাবেই বারবার সামনে আসে, সেটি হলো জিয়া পরিবার। দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে শুরু করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই; প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে এই পরিবারটি এদেশের মানুষের আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

দীর্ঘ ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখনই কোনো সংকটে পড়েছে জিয়া পরিবারের নেতৃত্বই দলকে এবং দেশের জনগণকে পথ দেখিয়েছে। নানা চড়াই-উতরাই, বারবার আঘাত এবং নির্মম নির্যাতনের পরও দেশের মানুষের মন থেকে এই পরিবারের নাম মুছে ফেলা যায়নি; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জিয়া পরিবারের প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হয়েছে।

বিএনপির দীর্ঘ পথচলায় নেতৃত্বের তিনটি সুস্পষ্ট স্তর বা প্রজন্ম দেখা যায়, যা পুরোটাই জিয়া পরিবারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। প্রথম স্তরে রয়েছেন দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

১৯৭৮ সালে তার হাত ধরেই বিএনপির প্রতিষ্ঠা। একদলীয় বাকশাল শাসনের পর দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম হয়েছিল তারই নেতৃত্বে। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছেন দলের সাবেক চেয়ারপারসন, ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ ও আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক শাহাদাতের পর যখন বিএনপির অস্তিত্ব চরম সংকটে তখন এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে তিনি দলের হাল ধরেন। তার নেতৃত্বেই বিএনপি স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে জয়লাভ করে এবং দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

তৃতীয় স্তরে রয়েছেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএনপিকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও যুগোপযোগী রাজনৈতিক দলে পরিণত করার মূল কারিগর তিনি। তৃণমূল থেকে রাজনীতি শুরু করা তারেক রহমান দলের তরুণ প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধ করে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।

জিয়া পরিবারের প্রতিই বারবার আঘাত
দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে জিয়া পরিবারের নিবিড় সম্পর্ক থাকার কারণেই দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে এই পরিবার। জিয়া পরিবারের ওপর প্রথম বড় আঘাতটি আসে ১৯৮১ সালের ৩০ মে, যখন এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নির্মমভাবে শহীদ হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

এরপর মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনের ১/১১-এর অসাংবিধানিক সরকার থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে জিয়া পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার সর্বাত্মক ব্লু-প্রিন্ট বাস্তবায়ন করা হয়। জিয়া পরিবারকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই বারবার তাদের ওপর আঘাত হানা হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারাই বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ধ্বংস করতে চেয়েছে। তারাই সর্বপ্রথম জিয়া পরিবারকে টার্গেট করেছে।

খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের ওপর নির্মম নির্যাতন
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামল ছিল জিয়া পরিবারের জন্য এক অন্ধকার ও বিভীষিকাময় অধ্যায়। বিরোধী দলের (আওয়ামী লীগ) রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চরম শিকার হন বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান।

তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় সাজা দিয়ে কারাবন্দি করা হয়। নাজিমুদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত ও স্যাঁতসেঁতে কারাগারে তাকে অমানবিক জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়। সুচিকিৎসার অভাবে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর চালানো হয় অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ১/১১-এর সময় রিমান্ডের নামে তার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে আওয়ামী শাসনামলে তার বিরুদ্ধে একের পর এক ডজন ডজন মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দেওয়া হয়। দেওয়া হয় ফরমায়েশি রায়। এমনকি তার ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোও এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। এত নির্মম নির্যাতনের পরও তারা দেশ ও জনগণের স্বার্থে একবিন্দুও আপস করেননি।

দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্রপ্রহরী
জিয়া পরিবার বরাবরই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্রপ্রহরী হিসেবে দেশবাসীর কাছে সমাদৃত। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দিশেহারা জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সম্মুখ সমরে লড়াই করেছেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর জিয়াউর রহমান বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। বেগম খালেদা জিয়াও তার রাজনৈতিক জীবনে কখনো দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে কারও সঙ্গে আপস করেননি। ‘এ দেশেই আমার জন্ম, এ দেশেই আমার মৃত্যু’, তার এই সাহসী উচ্চারণ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক অমোঘ মন্ত্র। বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তার প্রতিটি বক্তব্যে সমমর্যাদার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি এবং বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন, যা দেশের সাধারণ মানুষের মনে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আরও শাণিত করেছে।

দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণে জিয়া পরিবার
বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পেছনে জিয়া পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য। জিয়াউর রহমানের বিখ্যাত ‘১৯ দফা’ কর্মসূচির মূল লক্ষ্যই ছিল উৎপাদনমুখী রাজনীতি এবং গ্রামনির্ভর অর্থনীতি। তার ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ দেশে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছিল। পল্লী বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে তিনি গ্রামের অন্ধকার দূর করার উদ্যোগ নেন। এছাড়া, পোশাকশিল্প ও জনশক্তি রপ্তানির যে শক্ত ভিত তিনি রচনা করেছিলেন, তা আজও বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।

পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও প্রসারিত হয়। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালুর ফলে নারী শিক্ষায় যে নীরব বিপ্লব ঘটে তা গ্রামীণ নারীদের কর্মমুখী ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলে। কৃষকদের জন্য ভর্তুকি ও কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিএনপি সরকার সবসময় প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করেছে।

তারেক রহমানের পরিপক্ব রাজনীতি
বিগত বছরগুলোতে, বিশেষ করে চরম বৈরী ও প্রতিকূল পরিবেশে তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও পরিপক্বতা দেশবাসীকে বিস্মিত করেছে। হাজার হাজার মাইল দূরে লন্ডনে নির্বাসিত জীবনে থেকেও তিনি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের নেতাকর্মীদের এক সুতোয় বেঁধে রেখেছেন।

আওয়ামী লীগের সাজানো পাতানো নির্বাচনগুলো বর্জন করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যে অহিংস ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তা তার দূরদর্শিতারই প্রমাণ। ২০২৩ সালে তিনি রাষ্ট্র মেরামতের ‘৩১ দফা’ রূপরেখা ঘোষণা করেন। এই ৩১ দফায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো যুগান্তকারী প্রস্তাবনা রয়েছে, যা তার আধুনিক ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিফলন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে যখন একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা ছিল তখন তারেক রহমান দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন কোনো ধরনের প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের রাজনীতিতে না জড়াতে। তার এই পরিপক্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

দেশের নেতৃত্বে বারবার ফিরে এসেছে জিয়া পরিবার
ইতিহাস প্রমাণ করে জিয়া পরিবারকে কখনো জোর করে ক্ষমতার বাইরে রাখা যায়নি। যখনই দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে জিয়া পরিবারকে বিপুল ম্যান্ডেট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে বসিয়েছে। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সকল জরিপ ও হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। ২০০১ সালের নির্বাচনেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দলটি ক্ষমতায় আসে।

দেড় দশক ধরে আওয়ামী লীগ সরকার শত চেষ্টা করেও বিএনপিকে ভাঙতে বা জিয়া পরিবারের প্রতি মানুষের ভালোবাসা কমাতে পারেনি। ২০২৪ সালে স্বৈরাচারের পতনের পর আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রবাস থেকে ফিরে দেশের নেতৃত্বে তারেক রহমান
দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসন শেষে তারেক রহমান আজ দেশের মানুষের কাছে একটি নতুন প্রত্যাশার নাম। বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের অবসানের পর বাংলাদেশ এখন একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে। তরুণ সমাজ, যারা বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে, তারা তারেক রহমানের ৩১ দফার মাঝেই আগামীর বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর গোলাম হাফিজ বলেন, জিয়া পরিবার কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবার নয়; এটি বাংলাদেশের মাটি, মানুষ এবং জাতীয়তাবাদের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শত আঘাত, অপপ্রচার ও নির্যাতনের পরও এ দেশের মানুষ বিশ্বাস করে, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্রের সবচেয়ে নিরাপদ রক্ষাকবচ হলো জিয়া পরিবার। আর তাই, যুগের পর যুগ ধরে জিয়া পরিবারের প্রতিই মানুষের এই অবিচল আস্থা অটুট রয়েছে।

বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, জিয়া পরিবারের নেতৃত্বে বিএনপি বারবার ক্ষমতায় যেমন গেছে, আবার ক্ষমতা থেকে বাইরে এসে নিগৃহীত হয়েছে, হামলা-মামলার শিকার হয়েছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেমন এই দলকে বিকশিত করেছেন, ঠিক তেমনি মিথ্যা মামলায় তিনি জেলও খেটেছেন। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শুধু না, তিনি মুসলিম জাহানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী মহিলা হিসেবে। ঠিক তেমনি একজন জিয়াউর রহমানও জেনারেল হয়ে এই দেশের গণতন্ত্র শুধু পুনঃপ্রতিষ্ঠাই করেননি গণতন্ত্রকে বিকশিতও করেছেন।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর