আট বছর পর বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন ঘিরে চা বাগানগুলোতে শুরু হয়েছে আলোচনা। শ্রমিকদের প্রত্যাশা, এবার এমন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে, যারা মজুরি বৃদ্ধি, নিয়মিত বেতন পরিশোধ এবং ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। পুরোনো নেতৃত্বের কর্মকাণ্ড নিয়েও শ্রমিকদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা।
আগামী ২৮ নভেম্বর বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। দেশের ২৩১টি চা বাগান পঞ্চায়েতে প্রায় ৯৮ হাজার শ্রমিক ভোট দেবেন। একই দিনে ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং সাতটি ভ্যালির নেতৃত্ব নির্বাচনেও ভোট নেওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে বাগানে বাগানে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দীর্ঘ বিরতির পর এই নির্বাচনকে নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে দেখছেন শ্রমিকেরা। দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি, নিয়মিত বেতন, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশা রয়েছে। তাঁরা মনে করছেন, নতুন নেতৃত্বকে এসব সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে।
মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া খাইরুন আক্তার বলেন, আট বছর ধরে নির্বাচন না হওয়ায় কমিটিগুলোতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। নির্বাচন হলে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা বাড়বে। পাশাপাশি নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হবে।
হবিগঞ্জের চা বাগানগুলোতেও নির্বাচন নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। জেলার মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলায় মূল ও ফাঁড়ি মিলিয়ে ৪১টি চা বাগান রয়েছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর এসব বাগানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভূমিকা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। তাঁদের প্রত্যাশা, যাঁরা শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলবেন এবং দাবি আদায়ে কাজ করবেন, তাঁরাই নেতৃত্বে আসবেন।
সুরমা চা বাগানের শ্রমিক নেতা প্রদীপ কৈরি বলেন, ‘যারা চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলবেন, শ্রমিকেরা তাদের নির্বাচিত করবেন। অনেকেই নেতা হয়ে নিজের আখের গুছিয়েছেন। তাদের বয়কট করা হবে।’
দারাগাঁও চা বাগানের শ্রমিক রনি গোয়ালা বলেন, শ্রমিকেরা এমন নেতৃত্ব চান, যারা তাঁদের দুঃখ-কষ্ট বুঝবেন। মজুরি বৃদ্ধি, নিয়মিত বেতন এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। নির্বাচিত নেতারা এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করবেন এটাই তাঁদের চাওয়া।
তেলিয়াপাড়া চা বাগানের শ্রমিক নেতা স্বরজিত পাশি বলেন, নির্বাচন আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল। যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে শ্রমিকদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এখন শ্রমিকেরা অনেক সচেতন। তাঁরা বুঝেশুনে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনে সক্রিয় রয়েছেন।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৬৭টি মূল ও ৬৪টি ফাঁড়ি চা বাগান রয়েছে। প্রতিটি বাগানে একটি করে পঞ্চায়েত আছে। এসব পঞ্চায়েতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫ সদস্যের কমিটি নির্বাচিত হবে। পাশাপাশি ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং সাতটি ভ্যালির নেতৃত্ব নির্বাচনেও ভোট নেওয়ার কথা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় সভাপতি পদে রামভাজন কৈরী, রাজু গোয়ালা ও পঙ্কজ কন্দ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে নিপেন পাল ও পরেশ কালিন্দির নেতৃত্বাধীন প্যানেল নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পর ভ্যালি ও পঞ্চায়েত পর্যায়ে প্রার্থীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। নির্বাচনে সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রার্থী এবং ছয় শতাধিক প্যানেল অংশ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাতটি ভ্যালি হলো লস্করপুর, বালিশিরা, মনু-ধলাই, লংলা, জুড়ী, সিলেট ও চট্টগ্রাম। প্রতিটি ভ্যালির অধীনে ২৫ থেকে ৩০টি বাগান পঞ্চায়েত রয়েছে।
আগামী ২৮ নভেম্বর সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের কথা রয়েছে। শ্রীমঙ্গল শ্রম অধিদপ্তরের উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন বলেন, ৩০ অক্টোবর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে।
আট বছর পরের এই নির্বাচন ঘিরে শ্রমিকদের আগ্রহের পাশাপাশি নতুন নেতৃত্বের কাছে প্রত্যাশাও বাড়ছে। কারা নির্বাচিত হবেন, তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নির্বাচনের পর শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি-দাওয়া আদায়ে তাঁরা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবেন, সেটিই হবে নতুন নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
আজকের সিলেট ডেস্ক 








