সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমদ হত্যা মামলায় প্রধান আসামি সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তবে রায় ঘোষণার পরও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, পলাতক আকবরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কীভাবে? উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর তিনি কীভাবে দেশ ছাড়লেন, আর তাঁকে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল?
বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবদুল মজিদ মুন্সী এ রায় ঘোষণা করেন। একই মামলায় দুই পুলিশ কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও হারুন অর রশিদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপর তিন আসামি বহিষ্কৃত এএসআই আশেক এলাহী, এসআই হাসান উদ্দিন ও সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমানকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন জানিয়েছেন, মামলার ছয় আসামির মধ্যে একমাত্র আশেক এলাহী কারাগারে রয়েছেন। বাকি পাঁচজন পলাতক। ফলে আদালতের রায়ের পাশাপাশি এখন আলোচনায় এসেছে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং তাঁদের সাজা কার্যকরের বিষয়টি।
২০২০ সালের ১০ অক্টোবর রাতে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করা হয়। পরদিন ১১ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। নগরের আখালিয়া নিহারিপাড়ার বাসিন্দা রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর স্ত্রী তাহমিনা আক্তার কোতোয়ালি থানায় পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন। পরে তদন্তে নির্যাতনের সত্যতা উঠে আসে।
ঘটনার পর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরে মামলার তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৫ মে ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় সংস্থাটি। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
মামলার প্রধান আসামি আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর কানাইঘাট সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর গত বছরের আগস্টে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে ১১ আগস্ট সিলেট কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
এরপর ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ তাঁর জামিনের আদেশের বিরুদ্ধে পিটিশন ফর লিভ টু আপিল করে। পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজ উচ্চ আদালতের আদেশ স্থগিত করে তাঁকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। তবে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি।
রায়হানের মা সালমা বেগমের অভিযোগ, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর আকবর ভারতে পালিয়ে যান। ১২ আগস্ট রাত সাড়ে আটটার দিকে আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে তাঁর ভারতে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে আকবরের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, জামিনের পর একজন গুরুত্বপূর্ণ মামলার আসামির দেশত্যাগ ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল। তাঁর জামিন স্থগিত হওয়ার পরও কেন তাঁকে আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি, আর তাঁর অবস্থান শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
রায় ঘোষণার দিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন রায়হানের মা সালমা বেগম। প্রধান আসামিসহ অন্য আসামিদের জামিনে মুক্ত হয়ে পলাতক থাকার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
সালমা বেগম বলেন, “এই রায় শুনে আমি কী করব? আমার রায়হানকে যারা নির্যাতন করে মেরেছে, তারা তো পালিয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকার থাকতে একজনেরও জামিন হয়নি। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে মামলার আর্গুমেন্ট শেষ হওয়ার পরও কীভাবে প্রথম তিনজন আসামি জামিন পান? জামিন পেয়ে কীভাবে তাঁরা পালিয়ে যান?”
ক্ষোভ প্রকাশ করে রায়হানের মা বলেন, “আজ শুধু কাগজে-কলমে রায় হবে। আসামিরা শাস্তি পাচ্ছেন না। তাঁরা শাস্তি না পেলে আমার ছয় বছরের অপেক্ষা আর কষ্ট বিফলে যাবে।”
সালমা বেগমের এই ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে বিচারিক রায় ও তার বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান। আদালত আসামিদের দণ্ড দিলেও তাঁরা পলাতক থাকলে সেই সাজা কার্যকর করার জন্য তাঁদের গ্রেপ্তার করা জরুরি। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আকবরকে কোথায় পাওয়া যাবে, তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কী এবং এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব কী এসব প্রশ্নের জবাব চান বিচারপ্রত্যাশীরা।
রায়হান হত্যা মামলায় আদালতের রায় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে পাঁচ আসামি পলাতক থাকায় তাঁদের গ্রেপ্তার ও দণ্ড কার্যকরের বিষয়টি সামনে এসেছে।
আকবরের জামিন, কারাগার থেকে মুক্তি, জামিন স্থগিত হওয়ার পরও আত্মসমর্পণ না করা এবং তাঁর সম্ভাব্য দেশত্যাগের অভিযোগ প্রতিটি বিষয় নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। এসব ঘটনায় কোন কর্তৃপক্ষের কী দায়িত্ব ছিল এবং দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরও তাই রায়হানের পরিবারের অপেক্ষা পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাঁদের প্রত্যাশা, শুধু রায় ঘোষণা নয়, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতের দণ্ড কার্যকরের পথও নিশ্চিত করা হবে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









