ঐতিহাসিক গিলাফ ছড়ানোর মধ্য দিয়ে হজরত শাহজালালের (র.) মাজারে ৭০৫তম ওরসের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে এতে যোগ দিতে দূর-দূরান্ত থেকে জড়ো হয়েছেন ভক্ত ও অনুরাগীরা।
মঙ্গলবার সকাল থেকে ওরস উপলক্ষ্যে দলে দলে এসে মাজারে গিলাফ দিচ্ছেন ভক্তরা। ‘লালে লাল, বাবা শাহজালাল’ স্লোগানে মুখরিত পুরো মাজার এলাকা।
দুই দিনব্যাপী ওরসকে ঘিরে হজরত শাহজালাল (র.) এর দরগাহ এলাকায় নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। শান্তিপূর্ণভাবে ওরস সম্পন্ন করতে প্রশাসন এবং মাজার কর্তৃপক্ষ নিয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর আরবি জিলকদ মাসের ১৯ ও ২০ দুই দিনব্যাপী হজরত শাহজালালের (র.) ওরশ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সকালে ঐতিহাসিক গিলাফ ছড়ানোর মাধ্যমে ওরস কার্যক্রমের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে শাহজালাল (র.) দরগাহ কর্তৃপক্ষ।
বুধবার ভোর রাতে অনুষ্ঠিত হবে আখেরি মোনাজাত। এরপর শিরনি বিতরণের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে দুই দিনব্যাপী এই ওরসের কার্যক্রম।
ওরস উপলক্ষ্যে ভক্ত-অনুরাগীরা অর্ধশতাধিক গরু ও খাসি এনেছেন নাজরানা হিসেবে। সারাদেশ থেকে আসা ভক্ত-অনুরাগীরাদের মধ্যে শিরনি বিতরণের জন্য পশুগুলো জবাই করা হয়। এই সময়ে ভক্তরা জিকির ও এবাদত বন্দেগির মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করবেন।
ওরসের উপলক্ষ্যে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দরগাহ এলাকায় বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক সিসি ক্যামেরা এবং মাজারের প্রত্যেকটি প্রবেশ দ্বারে বাড়ানো হয়েছে বাড়তি পুলিশি নিরাপত্তা।
এ উপলক্ষে জেলা ও টুরিস্ট পুলিশ, র্যাব, এবং আনসার বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা। বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক সিসি ক্যামেরা।
প্রতি বছর আরবি মাসের ১৯ ও ২০ জিলক্বদ ওরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। ওরস উপলক্ষে মাজারে গিলাফ প্রদান করেছেন সিলেট সিটি মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বিশাল গরু দরবারে নজরানা প্রদন করেন এবং প্রধান মন্ত্রীর কনিষ্ট বোন শেখ রেহানার নামের একটি গরু প্রদান করেন।
রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এবং কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভক্ত-আশেকানরা বলেন, হযরত শাহজালালের (রহ.) টানে প্রতিবছর শত কষ্ট স্বীকার করেও হলেও ছুটে আসেন তারা। নিজেদের জীবনের সন্তুষ্টির পাশাপাশি ভক্তরা প্রার্থনা করেন দেশ ও দশের মঙ্গল। কেবল ইসলাম ধর্মাবলম্বীরাই নয়, বিভিন্ন জাতি ধর্মের মানুষের পদচারণায় দরগাহ প্রাঙ্গণ যেন হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক মিলন মেলার তীর্থভূমি।
কুমিল্লা থেকে আসা আরফে রাব্বানী শাহ আবদুস সোবহান রিসার্চ সোসাইটির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান বলেন, দুই বছর করোনার জন্য এবং ২০২৩ সালে সিলেটে ভয়াবহ বন্যার কারণে ভক্তরা ওরস করতে পারেনি। এ বছর তাই ভক্তদের ঢল নেমেছে। কয়েকদিন ধরে ভক্ত-আশেকানদের ভিড় বেড়েই চলেছে মাজার এলাকায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ওরসে শরীক হতে আসতে শুরু করেছেন হাজার হাজার মানুষ। তাদের অনেকেই অবস্থান করছেন মাজারের আশপাশের হোটেলগুলোতে।
দরগাহ্ এর পাশের হোটেল আল আরব এর সিনিয়র ম্যানেজার হুমায়ুন কবির নবিন জানান, দরগাহ্ পাশে পরস শরীফ উপলক্ষে আবাসিক হোটেলের কোন রুম খালি নেই ৪ দিন যাবত। লোকজন কোনমতে একটি খালি রুমের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য বললেও পাওয়া যায়নি।
আবার অনেকেই বাস ট্রাক নিয়ে এসেছেন, অবস্থান করছেন গাড়িতেই। ফলে মঙ্গলবার থেকেই মাজার এলাকা মুখর হয়ে উঠেছে হাজারও লোক সমাগমে।
ওরস উপলক্ষে ভক্ত-আশেকানরা শতাধিক গরু ও খাসি এনেছেন নজরানা হিসাবে। যা দিয়ে সারাদেশ থেকে আসা ভক্ত-আশেকানদের জন্য শিরনি করা হয়। শুক্রবার গভীর রাত পর্যন্ত জিকির ও এবাদত বন্দেগির মাধ্যমে ভক্তরা সময় অতিবাহিত করবেন।
এদিকে ওরসকে ঘিরে মাজার প্রাঙ্গণে বসেছে, বাউলদের আসর। শান্তিপূর্ণভাবে বার্ষিক এই উৎসব সম্পন্ন করতে মাজার কর্তৃপক্ষ সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৩ স্তরের নিরাপত্তার পাশাপাশি রয়েছে দরগাহর নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক টিম। দরগাহর নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা তদারকি বাহিনির সদস্য প্রায় ৪ শতাধিক।
হজরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহর সাধারণ সম্পাদক শামুন মাহমুদ খান বলেন, মাজার কমিটি সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এবার পরিবেশ অনুকূলে থাকায় ওরসকে কেন্দ্র করে ভক্ত ও আশেকানদের ভীড় লক্ষনীয়। প্রথম দিন বৃষ্টি থাকলেও ওরসের দিন ১১টার পর থেকে বৃষ্টি না থাকায় শাহজালাল বাবার ওরসে ভক্ত ও আশেকানদের উপচে পরা ভীড় লক্ষ্যনীয়।
ওরস শরীফের সরেকওম মোতওয়ালী ফতেহ উল্লাহ আল আমান জানান, আমরা আল্লাহর রহমতে শাহজালাল বাবার ওরসের সব কার্য সম্পাদন করেছি।
সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী শাহজালালের (র.) মাজার এরিয়ায় আছে। প্রায় ৫ শতাধিক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।প্রসঙ্গত, ইসলাম প্রচারের জন্য হজরত শাহজালাল (র.) ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে ৩৬০ জন সফরসঙ্গী নিয়ে সিলেটে আসেন। ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জিলকদ তিনি ইন্তেকাল করেন। সিলেটে তিনি যে টিলায় বসবাস করতেন, সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। তার কবরকে ঘিরেই পরে গড়ে উঠেছে মাজার।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিউজ ডেস্ক 








