একদিকে বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ছয় থেকে আট শত টাকা মণে, অন্যদিকে সেই ধান থেকে তৈরি চালের দাম উঠেছে আড়াই হাজার ছয়শত থেকে আড়াই হাজার আটশত টাকা মণ। সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বাজারে এই মূল্যবৈষম্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। সরকার নির্ধারিত ধানের ন্যায্যমূল্য এক হাজার চার শত চল্লিশ টাকা হলেও উৎপাদকরা তার অর্ধেক দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, এমন দামে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও অনেকের উঠছে না। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, ধান কেনা ও চাল বিক্রির ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় বাজারে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এ বছর আগাম বন্যা ও অতিরিক্ত বৃষ্টিতে হাওরের প্রায় চল্লিশ শতাংশ জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। অবশিষ্ট ফসল ঘরে তোলার পরও কৃষকদের পড়তে হয়েছে নতুন সমস্যায়। অনেক কৃষক সরকারি গুদামে ধান দিতে না পারায় ঘরেই তা মজুত করে রেখেছেন। কাটার পর আর্দ্রতার কারণে এসব ধানের রং কালচে হয়ে গেছে।
ব্যবসায়ীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ধানের গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার কথা বলে কম দামে ফসল কিনে নিচ্ছেন বলে কৃষকদের অভিযোগ।
কালিপুর গ্রামের কৃষক বদিউজ্জামান এরই মধ্যে তার সব ধান ৬৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে দিয়েছেন। তিনি জানান, প্রতি ত্রিশ শতাংশ জমিতে আট থেকে নয় হাজার টাকা খরচ হয়। ওই জমিতে ১০ থেকে ১২ মণ ধান উৎপাদন হয়। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচেরও অর্ধেক ফেরত পাওয়া যায়নি।
মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বড় কৃষক আব্দুস সালাম প্রায় হাজার মণ ধান উৎপাদন করেছেন। কিন্তু বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় সেই ধান বিক্রি করতে পারছেন না তিনি।
আব্দুস সালাম বলেন, পাইকাররা ছয় থেকে আট শত টাকার বেশি দাম দিতে রাজি নয়। তাঁর এলাকার শত শত কৃষক একইভাবে লোকসানের মুখে পড়েছেন।
এ মৌসুমে সুনামগঞ্জে ধানের উৎপাদনও যথেষ্ট বেড়েছে। সরকার ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। এর মধ্যে প্রায় বিশ হাজার মেট্রিক টন সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ও সরকারি সংগ্রহ বাড়লেও চালের বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়েনি।
বর্তমানে চাল বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি আড়াই হাজার ছয়শত থেকে আড়াই হাজার আটশত টাকায়। অর্থাৎ ভোক্তাদের চাল কিনতে দিতে হচ্ছে চড়া দাম, অথচ সেই চালের মূল উৎপাদক কৃষক পাচ্ছেন ধানের জন্য সর্বনিম্ন মূল্য।
সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য মোনাজ্জির হোসেন সুজন বলেন, সুনামগঞ্জের কৃষক হাওরের ধানের ওপর নির্ভরশীল। ন্যায্যমূল্য না পেলে তাদের নানা সংকটে পড়তে হয়। বাজারে কোনো সিন্ডিকেট থাকলে তা ভেঙে কৃষকের স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদারের মতে, স্থানীয় পর্যায় থেকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা গেলে এ সংকটের সমাধান সম্ভব।
তিনি বলেন, কৃষকরা বর্তমানে বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে ধান বিক্রি করছেন। পাইকাররা ধান কালচে হয়ে যাওয়ার অজুহাতে কম দামে কিনলেও চালের দাম কমাচ্ছে না। তাঁর মতে, এ পরিস্থিতি বাজার নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত স্পষ্ট করে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি 








