পতিত জায়গায় ২ হাজার বস্তায় আদা, ৫০ হাজার টাকায় ৩ লাখের স্বপ্ন
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৪ PM

পতিত জায়গায় ২ হাজার বস্তায় আদা, ৫০ হাজার টাকায় ৩ লাখের স্বপ্ন

বাহুবল (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৭/০৯/২০২৬ ০৯:১৫:০৪ AM

পতিত জায়গায় ২ হাজার বস্তায় আদা, ৫০ হাজার টাকায় ৩ লাখের স্বপ্ন


হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার বারআউলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদের বাড়ির আমবাগানের যে জায়গা একসময় পড়ে থাকত, এখন সেখানে সারি সারি বস্তা। প্রতিটি বস্তায় বেড়ে উঠছে সবুজ আদার গাছ। বাড়ির আঙিনার অব্যবহৃত জায়গাকে কাজে লাগিয়ে বস্তায় আদা চাষের এই উদ্যোগে এখন বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।

প্রচলিত কৃষিজমির বদলে বস্তায় আদা চাষকে তুলনামূলক সহজ পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিয়েছেন আব্দুল মজিদ। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমার্জেন্সি অ্যাসিসটেন্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ)-এর মাধ্যমে মসলা আদা প্রদর্শনীর আওতায় প্রথমবারের মতো প্রায় ২ হাজার বস্তায় বারি আদা-২ জাতের আদা চাষ শুরু করেন তিনি।

সরেজমিনে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আমবাগানের ফাঁকা জায়গাজুড়ে রাখা হয়েছে অসংখ্য বস্তা। সেগুলোতে সতেজভাবে বেড়ে উঠছে আদার গাছ। নিয়মিত পরিচর্যা, প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে সময় দিচ্ছেন কৃষক।

আব্দুল মজিদ জানান, ২ হাজার বস্তায় আদা চাষে তাঁর প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বস্তা প্রস্তুত, মাটি ও অন্যান্য উপকরণ এবং পরিচর্যাসহ বিভিন্ন খাতে এই অর্থ ব্যয় হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তিনি সার, কীটনাশক ও রোপণের জন্য আদার বীজও পেয়েছেন।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং গাছের বর্তমান বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে মৌসুম শেষে প্রায় ৩ হাজার কেজি আদা উৎপাদনের আশা করছেন তিনি। উৎপাদিত আদা বাজারে বিক্রি করে প্রায় ৩ লাখ টাকা পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে তাঁর।

কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, বাড়ির আমবাগানের অনেক জায়গা আগে কোনো কাজে লাগত না। সেই পতিত জায়গায় বস্তায় আদা চাষ করে তিনি এখন ভালো ফলনের আশা করছেন। অল্প জায়গায় বস্তা বসিয়ে চাষ করা যায় বলে এ পদ্ধতিটি তাঁর কাছে সুবিধাজনক মনে হয়েছে।

কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরিচর্যা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শামীমুল হক শামীম তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন।

শুরু থেকেই আব্দুল মজিদের এই উদ্যোগের সঙ্গে ছিলেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শামীমুল হক শামীম। তিনি নিয়মিত বাগান পরিদর্শন করে চাষাবাদ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন।

শামীমুল হক শামীম বলেন, ‘চেষ্টা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে কৃষক আব্দুল মজিদ পতিত জমিতে বস্তায় আদা চাষ করে সফলতা অর্জনের পথে রয়েছেন। তিনি যেভাবে অব্যবহৃত জায়গাকে কাজে লাগিয়েছেন, তা অন্য কৃষকদের জন্যও অনুকরণীয়।’

তিনি আরও বলেন, আব্দুল মজিদের বস্তায় আদা চাষ দেখে এলাকার অনেক কৃষক এখন এ পদ্ধতির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কেউ কেউ সরাসরি তাঁর কাছে এসে বস্তায় আদা চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইছেন। কৃষি অফিস থেকেও তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কম জমি কিংবা বাড়ির আঙিনা ও পতিত জায়গা রয়েছে এমন কৃষকদের কাছেও পদ্ধতিটি আগ্রহ তৈরি করছে। কারণ, এতে প্রচলিত কৃষিজমির ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে বাড়ির আঙিনা, বাগান কিংবা অন্যান্য অব্যবহৃত জায়গাকে উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যায়।

স্থানীয় কৃষকদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে এ বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া শুরু করেছেন। আব্দুল মজিদের চাষাবাদ প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হলে আগামী মৌসুমে বাহুবলের বিভিন্ন এলাকায় বস্তায় আদা চাষ আরও বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাহুবল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চিন্ময় কর অপু বলেন, বাহুবলে বস্তায় আদা চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আধুনিক এ পদ্ধতিতে তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে আদা উৎপাদন করা সম্ভব। জমির পাশাপাশি বাড়ির আঙিনা ও অন্যান্য পতিত জায়গাকেও উৎপাদনের আওতায় আনা যায়।

তিনি বলেন, ‘বস্তায় আদা চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। এ পদ্ধতিতে চাষে ঝুঁকি কম থাকায় কৃষকরা উৎসাহিত হচ্ছেন। আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছি।’

কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে যারা নতুন পদ্ধতিতে চাষ করতে আগ্রহী, তারা কৃষি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে পারবেন। সঠিক জাত নির্বাচন, বস্তা প্রস্তুত, মাটি তৈরি, সার প্রয়োগ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে কৃষকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

গ্রামাঞ্চলের বাড়ির আশপাশে বিভিন্ন কারণে অনেক জায়গা বছরের পর বছর পতিত পড়ে থাকে। কোথাও ফলের বাগান, কোথাও বাড়ির সীমানা, আবার কোথাও পড়ে থাকে ফাঁকা জায়গা। পরিকল্পিতভাবে এসব স্থান কৃষিকাজে ব্যবহার করা গেলে একই জায়গা থেকে বাড়তি উৎপাদন ও আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আব্দুল মজিদের উদ্যোগে সেই সম্ভাবনারই একটি বাস্তব চিত্র দেখা যাচ্ছে। আমবাগানের গাছগুলো থেকে যেমন ফল পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তেমনি গাছের নিচে ও আশপাশের ফাঁকা জায়গায় রাখা বস্তাগুলো থেকেও উৎপাদিত হবে আদা। ফলে একই জায়গাকে কাজে লাগিয়ে একাধিক কৃষিপণ্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আগামীতে আরও বেশি বস্তায় আদা চাষ করার প্রত্যাশা রয়েছে আব্দুল মজিদের। তাঁর আশা, তাঁর উদ্যোগ সফল হলে এলাকার অন্য কৃষকরাও এ পদ্ধতিতে চাষাবাদে আগ্রহী হবেন।

মাত্র ২ হাজার বস্তা দিয়ে শুরু করা এই উদ্যোগ এখন স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সীমিত জায়গা, ৫০ হাজার টাকার বিনিয়োগ এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ কাজে লাগিয়ে প্রত্যাশিত উৎপাদন ও বাজারমূল্য পাওয়া গেলে বস্তায় আদা চাষ গ্রামীণ কৃষকদের বাড়তি আয়ের একটি সম্ভাবনাময় মাধ্যম হতে পারে।

আর সেই সম্ভাবনার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছেন বাহুবলের বারআউলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ যেখানে একসময় পড়ে থাকত পতিত জায়গা, এখন সেখানে সবুজ আদার গাছ। ৫০ হাজার টাকার বিনিয়োগ থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকার সম্ভাব্য আয়ের যে প্রত্যাশা তিনি করছেন, তা তাঁর নিজের পরিবারের পাশাপাশি আশপাশের কৃষকদেরও নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহিত করছে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর