সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং মানুষের কথা তুলে ধরা। একই সঙ্গে ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন তোলা ও সাধারণ মানুষের পাশে থাকাও একজন সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব। এমন মন্তব্য করেছেন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক। শনিবার রাতে নগরীর জিন্দাবাজারস্থ অভ্র সেন্টারে অভ্র প্রকাশন আয়োজিত বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক চিন্ময় আচার্য রচিত ‘স্মৃতির পথে আটচল্লিশ বছর’ গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মদন মোহন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ। লেখক, সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও গ্রন্থের প্রকাশক অপূর্ব শর্মার সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রবীন্দ্র গবেষক ও অনুবাদক মিহিরকান্তি চৌধুরী। গ্রন্থ ও মূল প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনা করেন প্রফেসর কবি স্বপন নাথ।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, ‘স্মৃতির পথে আটচল্লিশ বছর’ একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চার দশকেরও বেশি সময়ের সাংবাদিকতা, সমাজ, মানুষের জীবন এবং সময়ের পরিবর্তনের নানা দিক এতে প্রতিফলিত হয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে একজন সাংবাদিক সমাজের অসংখ্য মানুষের জীবনযাপন, পরিবর্তিত সময়, অন্যায়ের নানা বাস্তবতা, ক্ষমতার বিভিন্ন রূপ এবং মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে ওঠেন। তাই কোনো সাংবাদিকের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে একটি ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় ও সমাজের বাস্তব চিত্রও উঠে আসে।
তিনি আরও বলেন, বইটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে লেখক মানুষের হাসি-কান্না, বন্ধুত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক আবেগ এবং জীবনের নানা সংকট ও বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেছেন। নিজের সাফল্যের পাশাপাশি জীবনের দ্বিধা, সীমাবদ্ধতা এবং আত্মসমীক্ষার বিষয়গুলোও চিন্ময় আচার্য আন্তরিকতার সঙ্গে প্রকাশ করেছেন।
লেখক চিন্ময় আচার্যের সঙ্গে নিজের কর্মজীবনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, ‘আমি হবিগঞ্জের মানুষ। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক চিন্ময় আচার্য ও আমি সহকর্মী ছিলাম। আমি হবিগঞ্জের বহুল প্রচারিত দৈনিক খোয়াই পত্রিকায় বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। সেই সুবাদে তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার সুযোগ হয়েছে।’
সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিবর্তন নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, প্রযুক্তির উন্নয়নে সংবাদ প্রকাশ আগের তুলনায় অনেক দ্রুত হয়েছে। কিন্তু এর ফলে সংবাদ যাচাইয়ের দায়িত্ব কমে যায়নি। বরং তথ্যের অবাধ প্রবাহের সময়ে সাংবাদিকতার সঙ্গে সততা, দায়িত্ববোধ, বিবেক ও মানবিকতার বিষয়গুলো আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
গ্রন্থটির মানবিক দিক তুলে ধরে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, বইটির মাধ্যমে সাংবাদিক চিন্ময় আচার্যের পাশাপাশি ব্যক্তি চিন্ময় আচার্যকেও পাঠকের সামনে পাওয়া যায়। তাঁর প্রত্যাশা, ‘স্মৃতির পথে আটচল্লিশ বছর’ তরুণ সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে, গবেষকদের কাছে সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সাধারণ পাঠকের কাছে জীবন ও মানুষের গল্প হিসেবে গুরুত্ব পাবে।
প্রকাশনা উৎসবে বিশেষ অতিথি ও আমন্ত্রিত গুণীজনদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন লেখক ও সংস্কৃতিজন এবং সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রধান প্রনব কান্তি দেব, কবি ও ব্যাংকার সুমন বণিক, সহকারী অধ্যাপক হিমাংশু রঞ্জন দাস, ‘অনলাইন সিলেট’ সম্পাদক ম-লীর সভাপতি অ্যাডভোকেট মোস্তাকিম আহম্মদ কাওছার, সাংবাদিক আব্দুল হক মামুন, কবি রাহনামা সাব্বির চৌধুরী, সহযোগী অধ্যাপক হাসিনা ফেরদৌস, প্রিন্সিপাল সেনুয়ারা আক্তার চিনু, কবি ও সংগঠক রওশনারা বাঁশি, চিত্রশিল্পী আবদুল মালিক, ছড়াকার অজিত রায় ভজন, প্রভাষক রাজিব আচার্য ও দিলীপ চক্রবর্তী।
এ ছাড়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৌরভ গোপ, মোহাম্মদ তোহা, নারীনেত্রী রুনা সুলতানা, মহিবুর রহমানসহ সিলেটের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা পর্ব শেষে শিল্পী বিমান তালুকদারের মনোজ্ঞ সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









