পিরিয়ডের সময় মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম করার অভিজ্ঞতা অনেক নারীরই হয়ে থাকে। এ সময় শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের পাশাপাশি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, পানিশূন্যতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া কিংবা রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়ার মতো কারণেও এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই পিরিয়ডের সময় বারবার মাথা ঘোরার পেছনে ঠিক কী কারণ রয়েছে, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে শরীরে আয়রনের ঘাটতি তৈরি হয়ে অ্যানিমিয়া হতে পারে। এর ফলেও দুর্বলতা ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
শরীরে পর্যাপ্ত তরল না থাকলেও একই ধরনের সমস্যা হতে পারে। অপর্যাপ্ত পানি পান, বমি কিংবা ডায়রিয়ার কারণে ডিহাইড্রেশন হলে রক্তের পরিমাণ কমে যেতে পারে। এতে মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম করার অনুভূতি হতে পারে। এ ছাড়া হঠাৎ রক্তচাপ কমে গেলেও মাথা ঘুরতে পারে।
পিরিয়ডের ব্যথা ও ক্র্যাম্পের সঙ্গেও মাথা ঘোরা সম্পর্কিত হতে পারে। তীব্র ব্যথার কারণে ভ্যাসোভ্যাগাল প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা এবং কখনো অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
এ সময় বমি বমি ভাব, ক্ষুধামান্দ্য বা মাসিকজনিত অস্বস্তির কারণে অনেকে নিয়মিত খাবার খান না। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গিয়ে মাথা ঘোরার সমস্যা তৈরি হতে পারে। পর্যাপ্ত তরল পান, নিয়মিত খাবার গ্রহণ এবং বিশ্রাম নিলে কিছু ক্ষেত্রে এ সমস্যা কমতে পারে।
তবে মাথা ঘোরার সঙ্গে যদি অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়, তীব্র দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণের মতো গুরুতর উপসর্গ থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পিরিয়ডের সময় প্যাড বা ট্যাম্পন অস্বাভাবিক দ্রুত ভিজে যাওয়া, বড় আকারের রক্তের জমাট বের হওয়া কিংবা মাসিকের সময়কাল স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন। এসব লক্ষণ রক্তশূন্যতা বা অতিরিক্ত রক্তপাতের অন্য কোনো কারণের ইঙ্গিত হতে পারে।
হরমোনের পরিবর্তনেও হতে পারে মাথা ঘোরা
পিরিয়ডের সময় মাথা ঘোরার সঙ্গে হরমোনের ওঠানামারও সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। ব্রাজিলিয়ান জার্নাল অফ ওটোরিনোল্যারিঙ্গোলজিতে প্রকাশিত ২০০৯ সালের একটি গবেষণায় মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের পরিবর্তন এবং মাথা ঘোরা ও ভারসাম্যহীনতার সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়।
গবেষকদের মতে, ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রার পরিবর্তন অন্তঃকর্ণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে অন্তঃকর্ণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পিরিয়ড শুরুর আগে এসব হরমোনের মাত্রায় ঘন ঘন পরিবর্তন হলে শরীরে সোডিয়াম ও তরল জমে যেতে পারে। এতে কানের সূক্ষ্ম নালীগুলোর ভেতরে চাপ তৈরি হয়ে মাথা ঘোরা বা হালকা লাগার অনুভূতি হতে পারে।
ওই গবেষণায় ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে পিরিয়ডের আগের ও পরের পর্যায়ে নারীদের ভারসাম্যের পরিমাপযোগ্য পরিবর্তনও দেখা হয়েছিল। গবেষণায় শরীরে তরল জমে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাথা ঘোরা কমাতে যা করতে পারেন
পিরিয়ডের আগে লবণাক্ত খাবার কমিয়ে দিলে শরীরে অতিরিক্ত তরল জমার প্রবণতা কমতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে শরীরের তরল ও সোডিয়ামের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল কমিয়ে দেওয়াও উপকারী হতে পারে। এতে ডিহাইড্রেশন এড়ানোর পাশাপাশি অন্তঃকর্ণের তরলের ভারসাম্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে।
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থেকে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া ঠেকাতে অল্প অল্প করে নিয়মিত খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পর্যাপ্ত ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ। রাতে ভালোভাবে ঘুমালে হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে শরীর ও স্নায়ুতন্ত্রের মানিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম পাওয়া যায়।
হালকা শারীরিক কার্যকলাপ, যেমন হাঁটা, রক্তসঞ্চালন বাড়াতে এবং শরীরে অস্বস্তিকর ফোলাভাব কমাতে সহায়তা করতে পারে।
মাথা ঘুরতে শুরু করলে প্রথমে নিরাপদ জায়গায় বসে পড়া বা শুয়ে থাকা উচিত। মাথা ঘোরা না কমা পর্যন্ত হঠাৎ উঠে দাঁড়ানো এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। এ সময় গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামও করা যেতে পারে। এটি বমি বমি ভাব কমাতে এবং শরীরকে কিছুটা শান্ত করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে পিরিয়ডের সময় মাথা ঘোরার সমস্যা যদি তীব্র হয় বা নিয়মিত ঘটতে থাকে, তাহলে শুধু মাসিকের স্বাভাবিক উপসর্গ হিসেবে ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এর পেছনে অন্য কোনো অন্তর্নিহিত কারণ রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
লাইফস্টাইল ডেস্ক 








