ভেনেজুয়েলার কাতিয়া লা মারে ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত এলাকায় ধ্বংসস্তূপ পর্যবেক্ষণ করছেন এক উদ্ধারকর্মী। ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের চার দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক ব্যক্তি ও তার কিশোর ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরের কারাবালেদা শহরে তাদের উদ্ধার করেন উদ্ধারকারীরা। এদিকে গত সপ্তাহের জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৪৫০ ছাড়িয়ে গেছে।
এএফপির সাংবাদিকরা জানান, ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার পরপর দুটি ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত কারাবালেদায় ফরাসি ও মার্কিন উদ্ধারকারী দল প্রায় চার দিন পর বাবা-ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করে। ওই ভূমিকম্পে এলাকাটির প্রায় ২০০টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়ে।
দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ রোববার জীবিত মানুষ উদ্ধারে সফল হওয়ায় উদ্ধারকর্মীদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আজও আমরা জীবিত মানুষ উদ্ধার করেছি। তাই এই উদ্ধার অভিযান বন্ধ করা হবে না। আমরা সবসময় আশা ধরে রাখি।
এই উদ্ধারকাজ চলমান ট্র্যাজেডির মধ্যে আশার আলো দেখালেও, অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত দেশটিতে এখনও কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমাও ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। এই ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত লাখো মানুষ এখনো বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও অন্যান্য মৌলিক সেবার বাইরে রয়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে স্বজনদের খুঁজে পেতে অনেক বাসিন্দাকেও খালি হাতে ধসে পড়া ভবনের কংক্রিট ও ধ্বংসাবশেষ সরাতে দেখা গেছে।
রোববার জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, বুধবার সন্ধ্যায় আঘাত হানা ভূমিকম্পে ৭৭৪টি ভবন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪৫০ জনে পৌঁছেছে, আহত হয়েছেন ৩ হাজার ১৫০ জন। তবে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযান চললেও প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত বন্দরনগরী লা গুয়াইরায় লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। বুধবারের ভূমিকম্পে শহরটির বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ফার্মেসি, সুপারমার্কেটসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ভূমিকম্প-পরবর্তী সরকারি সহায়তা খুবই ধীরগতির এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
রোববার মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড জানায়, মার্কিন হেলিকপ্টারে করে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর পুনরায় চালু করতে আরও ২৩০ জন মার্কিন সামরিক সদস্য ভেনেজুয়ায় পৌঁছাচ্ছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ২৫০ সদস্যের একটি দুর্যোগ মোকাবিলা দল পাঠিয়েছে। তবে জীবিত উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা দিন দিন কমে আসছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এল সালভাদরের এক উদ্ধারকর্মী বলেন, এ পর্যায়ে হয়তো বেশির ভাগই মরদেহ হবে। তবে ঈশ্বরের কৃপায় হয়তো এখনো কিছু জীবিত মানুষকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।
কিছু এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভও বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, ভূমিকম্পে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়নি।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যের তানাগুয়ারেনা এলাকায় এক ব্যক্তি সেনাদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলেন, দেশের এখন আপনাদের প্রয়োজন। অস্ত্র নামিয়ে রাখুন। কোদাল আর শাবল হাতে নিন।
স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনরোষের মুখে প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য বিভিন্ন দেশকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, ২৪টি দেশ এখন পর্যন্ত ৫২১ টন ত্রাণসামগ্রী, ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষ শনাক্তে প্রশিক্ষিত ৮৬টি কুকুর এবং ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকর্মী পাঠিয়েছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, এই দুর্যোগে সর্বোচ্চ ৬৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাদের আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি ত্রাণসামগ্রীর প্রয়োজন হবে।
তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়ায় এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই ভূমিকম্প এমন সময়ে আঘাত হেনেছে, যখন দেশটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘ সংকটে হাসপাতাল ও জনসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং লাখো মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
জাতিসংঘের হিসাবে, এই ভূমিকম্পে অবকাঠামো পুনর্গঠনে প্রায় ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে, যা ভেনেজুয়ার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬ শতাংশের সমান। এদিকে নির্বাসিত ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো রোববার ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি খুব শিগগিরই দেশে ফিরবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘সময় এসে গেছে। আমাদের একসঙ্গে থাকতে হবে, একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে হবে, একসঙ্গে শোক প্রকাশ করতে হবে, আবার এই কঠিন সময়ে একে অপরকে শক্তিও জোগাতে হবে।’
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 








