আজ শনিবার, ৫ই জুন, ২০২০ ইং

পৌর কর্তপক্ষের উদাসীনতায় ক্রমেই ‘শ্রী’ হীন হচ্ছে শ্রীমঙ্গল

  • আপডেট টাইম : February 8, 2019 3:58 PM

কে এস এম আরিফুল ইসলাম, (শ্রীমঙ্গল) মৌলভীবাজার : শ্রীমঙ্গল শহরের মাঝ দিয়ে চলে গেছে ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক। শহরের ব্যস্ততম হবিগঞ্জ সড়ক থেকে মৌলভীবাজার সড়কের এক নম্বর ব্রীজ অংশের দুই কিলোমিটার এলাকায় মানুষের আনাগোনা সবচেয়ে বেশী।

সিলেট বিভাগের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে শ্রীমঙ্গল শহর দিন -রাত জেগে থাকে। প্রতিদিন ভোর থেকেই কর্মজীবি মানুষেরা বের হয়ে পড়েন জীবিকার তাগিদে, শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে চলেন বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে। কিন্তু চলাচলরত জনগণের পায়ে হেঁটে যাবার রাস্তা এতো মসৃণ নয়। রাস্তার পাশ দিয়ে হেটে যাবার পথ ক্রমশ মানবসৃষ্ট কারনে রুদ্ধ যাওয়ায় মানুষ হাটছে আ লিক মহাসড়ক ধরে, আর এতেই ঘটছে প্রতিনিয়ত ছোট – খাটো দুর্ঘটনা।

দোকানের সামনে দোকান গড়ে উঠছে শহরের বিভিন্ন জায়গায়। রাস্তার পাশে হকারদের দৌরাত্বে মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। পৌর এলাকা জুড়ে যানজট, অবৈধ যানবাহন স্ট্যান্ড ও পার্কিং, ভাসমান দোকান ও পথ ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ব, পার্কিং বে না থাকা, ঝুুঁকিপুর্ণ ড্রেণ, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ময়লা, দুর্গন্ধ, বিপর্যস্ত নাগরিক জীবন।

পৌরবাসীর এ বেহাল দশার ব্যাপারে এস কে দাশ নামে স্থানীয় পৌর এলাকার এক বাসিন্দা নিজের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের সময়কালে প্রাপ্ত স্বাধীনতাকে যদি কিছু মানুষ স্বেচ্ছাচারিতায় পর্যবসিত করে, ক্ষমতাকে কর্তৃত্ব মনে করে নাগরিক সমস্যাকে ঝুলিয়ে রাখার কারনে শ্রীমঙ্গলের শ্রী হারিয়েছে সেই কবে।

শ্রীমঙ্গল শহরের ব্যস্ততম সড়ক ধরে নেই ফুটপাত, যাও আছে তা দখলে। যানজট, শহরের বুকে, অবৈধ পাকিং, ড্রেণগুলো ঢাকনা বিহীন খোলা কোথাও বন্ধ – ভাঙা, নেই শহরের সৌন্দযবৃদ্ধির উদ্যোগ, নেই ডাস্টবিন! পাবলিক টয়লেট এমন জায়গায় যেদিকে কালেভদ্রে মানুষের যাতায়াত, নেই সচেতনতা সৃষ্টির কোনো উদ্যোগ, নেই অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা। একটা পর্যটন শহরের এ অবস্থা চলতে থাকলে অদুর ভবিষ্যতে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নেবে।

সমগ্র বিশ্বব্যাপী যেখানে শ্রীমঙ্গলের পর্যটনপিয়াসী স্থান হিসেবে সমাদ্রিত, অথচ পর্যটকরা এসে বিরুপ মনোভাব প্রকাশ করেন। পৌরবাসী সময়মত পৌরকর প্রদান করেও নাগরিক সেবা থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। আমাদের এখানে একে অপরের প্রতি দায়চাপানোর সংস্কৃতি আর রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পায়তারায় একটি সম্ভাবনাময় উপজেলা শ্রীমঙ্গল আজ শ্রীহীন।

বড় বড় গাড়ির গা ঘেঁষে চলছে আর রাস্তার ধারেই মানুষ নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে হাটে, ২০১৯ সালের উন্নয়নশীল ডিজিটাল বাংলাদেশে আমাদের এ অবস্থা দেখতে হবে, সইতে হবে তা খুবই দুঃখজনক। কেন এই উল্টোপথে যাত্রা? সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, জনগণকে জানান কিন্তু উদাসীনতা কাম্য নয়। আরো বললে বলতে হবে, পৌরসভা সমস্যা দেখেও না দেখার ভান করছে, শোনেও না শোনার মত করে আছে, সব বুঝেও অবুঝের মতো আচরণ করছে।

স্থানীয় বাসিন্ধা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সম্মিলিতভাবে অভ্যাস বদলানোর বিকল্প নেই, রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার কায়দায় সবকিছুকে বিচার বিবেচনা না করে, এর থেকে বেরিয়ে এসে নাগরিক সমস্যাসহ সকল দাবী – দাওয়ার কথা তুলে ধরতে হবে এবং পৌর কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই নাগরিক সমস্যার সমাধান করতে হবে তা যে উপায়েই হোক।

দেশের ১ম শ্রেণীভুক্ত এই পৌরসভার বর্তমান অবস্থা ও নাগরিক সেবা অত্যন্ত নাজুক। রাস্তার পাশে মানুষের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে মৌসুমী হকার ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভাড়ায় দোকানের সামনে অবৈধ ছোট ছোট করার কারনেই মানুষ বিপদজ্জনকভাবে মুল সড়কে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে যানজট এখন এ শহরের নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়, ট্রাফিক পুলিশদের এ যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে বেশ গলধঘর্ম হতে হয়। অবৈধ অটোরিক্সা ও টমটমের যাতায়াতের কারনে একটা জঞ্জালের শহরে রুপ নিয়েছে শ্রীমঙ্গল।

নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা পুরণে মেয়রকে সচেষ্ট হতে হবে, নাগরিকের চাওয়া – পাওয়া শুনতে হবে, সে অনুসারে নগরবিদের মাধ্যমে পরিকল্পনা প্রনয়ন করে সরকারের প্রকৃত উন্নয়নের সুফল জনগণের নিকট পৌঁছাতে হবে এবং সকল সমস্যা থেকে স্থায়ীভাবে উত্তরণকল্পে কাজ করতে হবে, বরাদ্দের ব্যাপারে সরকার বা দাতাসংস্থা অথবা সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়িয়ে শ্রীমঙ্গলের শ্রী ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, শ্রীমঙ্গল পৌরসভাকে মনের মাধুরী অনুযায়ী উন্নতদেশের মতো সাজানো যেত, যদি সব পক্ষ সাদামনে একে অপরের সাথে সমন্বয় রেখে কাজ করতেন। এখানকার নাগরিকরা যথেষ্ট সচেতন ও শ্রীমঙ্গলকে ভালোবাসেন। চারিদিকে অবৈধ যানবাহন, অবৈধ স্ট্যান্ড, অবৈধ পথব্যবসায়ী, ড্রেণের দুর্গন্ধ আর অস্তাচলে নাগরিক সেবা। পুরো বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে আর নিজেরা কেন অবনতির দিকে। পৌর কর্মীদের কাজের তদারকিও চোখে পড়ে না। যে যার মতো পারছে করছে।

স্থানীয় সাংস্কৃতিককর্মী নাগরদোলা থিয়েটারের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিতম পাল বলেন, পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে নাগরিকের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও যোগাযোগ এবং কানেকটিভিটি তৈরী করার উপর জোর দিতে হবে। পৌরভবন যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমন বা তারচেয়েও আধুনিক দৃষ্টিনন্দন পৌরসভা আমরা চাই। ডিজিটাল বাংলাদেশে সহজেই এখন মেয়র নাগরিকদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারেন, পরামর্শ নিতে পারেন, নিজের কাজের সীমাবদ্ধতা ও চলমান কাজ সম্পর্কে জানাতে পারেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা আ্যাপসের মাধ্যমে। এতে উদ্ভূত জনভোগান্তির সমাধান খুব সহজেই করা যাবে। নাগরিক সেবা হতে হবে মূল লক্ষ্য, অন্যকোন হিসাব নিকাশ করতে যেয়ে জনগণ যাতে বি ত না হোন সেদিকে সকল জনপ্রতিনিধিদেরকেই লক্ষ্য রাখতে হবে।

পৌরবাসীর ভোগান্তি ও শ্রীমঙ্গলের এ চিত্রের প্রেক্ষিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ ড. মো. আব্দুস শহীদ অতি সম্প্রতি নাগরিক ও সুধীজনদের নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় গভীর ক্ষোভ ও উষ্মা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, পর্যটন শহর শ্রীমঙ্গল পৌরসভা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। পৌরসভার কাউন্সিলরা মাকের্ট ও বরাদ্দের নামে দুর্নীতি করে লাখ লাখ টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। এখন সময় এসেছে যারা ৭ বছর ধরে ক্ষমতায় থেকে শ্রীমঙ্গল শহর বিকৃতরুপে পৌঁছেছে তাদেরই জবাবদিহি করতে হবে। নাগরিক সমস্যার সমাধান না করতে পারলে প্রস্তান করাই শ্রেয়। আমি সার্ভে করছি, তথ্য নিচ্ছি কারা অবৈধ দোকান বসিয়েছেন, কে তাদের সুযোগ দিয়েছে, কারা কারা রাজনৈতিক পরিচয়ে টাকা নেন, মাসোহারা নেয়। বলুন, কোন ড্রেনটা প্রতিদিন পরিস্কার হয়, আমার বাসার সামনেও ময়লা পড়ে থাকে। আইন, নিয়ম, রীতিনীতি আমাদের সবাইকে মানতে হবে, অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে, ব্যাপক হারে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

পৌরসভার প্যানেল মেয়র (১) মো. আব্দুল করিম বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্য পৌরসভার সকল সমস্যা দ্রুতগতিতে সমাধানের কথা বলেছেন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার জন্য বলেছেন। মেয়র সাহেব শ্রীমঙ্গলের বাইরে রয়েছেন, তিনি আসলে নাগরিক সমস্যার ব্যাপারে আলোচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ভাসমান ব্যবসায়ীদের দৌরাত্বের ব্যাপারে ও দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অন্য কারো থাকলে থাকতে পারে, আমার জানা নেই, আমি জানামতে কোন দুর্নীতি করিনি আর এদেরকে একবার উঠিয়ে দিলে আবার চলে আসে। পৌরকর্মীদের কাজের মনিটরিং সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, আমরা সেগুলো কাটিয়ে উঠছি।

পৌরসভার এ দৈন্যদশা ও উত্তরণের ব্যাপারে পৌর মেয়র মহসীন মিয়া’র নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি, আমাদের সীমাবদ্ধতা ও বরাদ্দ ঘাটতি রয়েছে, যে টাকা কর বাবদ আয় হয় সে টাকা দিয়ে কর্মচারীদের বেতন – ভাতা ইত্যাদি প্রদানের পর পৌরসভার অন্যান্য সকল দিক সংকুলান করা কষ্টসাধ্য।

যানজট ও হকারদের ব্যাপারে তিনি বলেন, এগুলো দেখার জন্য ট্রাফিক রয়েছে। ড্রেণ কোথাও ভাঙা, কোথাও নেই, কোথাও বর্জ্যে ভরপুর, কোথাও স্লাব নেই- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, নাগরিককে আরো সচেতন হতে হবে যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেলার ব্যাপারে এবং পৌরকর্মীদের কাজের ব্যাপারেও আরো বেশী নজর রাখা হবে। এছাড়া, বিভিন্ন পক্ষ থেকে সহযোগীতার অভাব রয়েছে বলেও তিনি জানান এবং সবার আন্তরিক সহযোগীতা কামনা করেন।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ