আজ শুক্রবার, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং

অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে শ্রীমঙ্গল

  • আপডেট টাইম : March 11, 2019 12:30 PM

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : জ্বালানি তেলের ডিপো তিনটির মাঝামাঝি অবস্থান দিয়ে বয়ে যাওয়া আখাউড়া-সিলেট রেল পথের শ্রীমঙ্গল রেল স্টেশন ইয়ার্ডে কনটেইনার ভর্তি জ্বালানি তেল খালাসের অপেক্ষায় থাকে প্রায়শই। মেঘনা পেট্রোলিয়াম লি. এর ডিপোর গেটে ও সামনে মার্কেটের বেশ কয়েকটি দোকানে সব সময় মজুদ থাকে এলপি গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার। এ ছাড়া রয়েছে বেশ কয়েকটি খোলা তেলের দোকান।

মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড থেকে ৫০ গজ দূরত্বে অবস্থিত পদ্মা অয়েল কোম্পানীর ডিপোর বাউন্ডারি ঘেঁষে গড়ে উঠেছে খোলা তেলের দোকান, খাবার হোটেল, পান-সিগারেটের দোকান ও ওয়েল্ডিং কারখানা। পদ্মা অয়েল থেকে মাত্র ৫/৭ গজ দূরত্বে অবস্থিত যমুনা অয়েল কোম্পানীর সামনে কোনো দোকান না থাকলেও মেঘনা বা পদ্মা ডিপোতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তা সেকেন্ডের মধ্যে যমুনা ডিপোতে ছড়িয়ে পড়ে ভস্মীভূত হয়ে যেতে পারে পুরো শহর- এমনটাই আশংকা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় লোকজন।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ডিপোর গেট সংলগ্ন মার্কেটে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কয়েকটি এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বেশ কয়েকটি ওয়েল্ডিং কারখানা। এ ছাড়া মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড থেকে মাত্র ৫০ গজের মধ্যে অবস্থিত পদ্মা অয়েল কোম্পানী লিমিটেড দেয়াল ঘেঁষে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ওয়েল্ডিং কারখানা ও পান-সিগারেটের দোকান।

ফলে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট বিভাগের জ্বালানি তেলের একমাত্র সংরক্ষাণাগার মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, পদ্মা অয়েল কোং লিমিটেড ও যমুনা অয়েল কোং লিমিটেডের ডিপোগুলো। এ ছাড়াও শ্রীমঙ্গল শহরবাসী মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এর আগেও গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে এলাকাবাসীর তড়িৎ পদক্ষেপের কারণে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে পাশাপাশি অবস্থানে থাকা তিনটি ডিপো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাশাপাশি অবস্থানে থাকা ডিপো তিনটিতে পেট্রোল ধারণ ক্ষমতা ৮ লাখ ৬৬ হাজার লিটার, অকটেন ৯ লাখ ৮৫ হাজার লিটার, ডিজেল ১৯ লাখ ২৭ হাজার লিটার ও কেরোসিন ধারণ ক্ষমতা ১৩ লাখ ৯ হাজার লিটার। অবশ্য সব সময় ধারণ ক্ষমতানুসারে জ্বালানি তেল মজুদ থাকে না।

খোজঁ নিয়ে জানা যায়, এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের ডিলারশিপ নিয়োগের প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো তেল ডিপোর কমপক্ষে ১ কিলোমিটার দূরত্বে গ্যাস সিলিন্ডারের গুদাম ও শো-রুম করতে হবে। শ্রীমঙ্গল উপজেলায় জন্য যে কয়টি লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে সব কয়টির ঠিকানা হবিগঞ্জ রোড, শ্রীমঙ্গল। যা তেল ডিপোগুলোর থেকে ১ কিলোমিটার দূরত্বে।

কিন্তু হবিগঞ্জ সড়কের নামে লাইসেন্স ইস্যু করিয়ে ন্যাশনাল গ্যাস ট্রেডিং কৃষ্ণচুড়া এন্টারপ্রাইজ, ফাতেমা ট্রেডার্স ও শাফি এন্ড ব্রাদার্স এ ৪টি ডিলার প্রতিষ্ঠান মেঘনা ডিপোর গেটে অবৈধভাবে চালিয়ে যাচ্ছে রমরমা ব্যবসা।

এ ছাড়া আলম ট্রেডার্স, অমিয়েংশু দাশ, কৈলাস প্রসাদ তেলী, আজিজ এন্টার প্রাইজ, গাউছিয়া-বাশারিয়া ট্রেডিং, কুহেলী এন্টারপ্রাইজ, কামাল ট্রেডার্স, নুরজাহান গ্যাস, রাজ এন্ড নওজেন কোম্পানী, আল-আমীন গ্যাস, কোরিয়া গ্যাস হাউস, কোরিয়া এন্টারপ্রাইজ প্রভৃতি ডিলারের বরাদ্ধকৃত গ্যাস উপরোক্ত ৪টি ডিলার প্রতিষ্ঠান উত্তোলন করে সিলেট, কুমিল্লা, চট্রগ্রাম, ভৈরব হবিগঞ্জসহ দেশের নানা স্থানে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে মেঘনা ডিপোর গেটে ট্রাক দাঁড় করিয়ে গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডারগুলো ট্রাকে বোঝাই করা হয়।

স্থানীয় এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের এক ব্যবসায়ী জানান, তারা যেভাবে দোকান দিয়েছেন তা আইন অনুসারে অবৈধ। তাদের ডিলারশিপ লাইসেন্স শহরের হবিগঞ্জ সড়কের ঠিকানায়। কিন্তু সেখানে ব্যবসা করা লাভজনক হবে না বিধায় তারা ডিপোর আশপাশেই দোকান খুলেছেন।

তিনি বলেন, আমরা এখনো ১০/২০টি গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার রাখি। বাকিগুলো গুদামে মজুদ করে রাখা হয়। যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটে জান-মালের ক্ষতি হতে পারে কি না এ প্রশ্ন করলে তিনি জানান, ডিপোগুলোর মধ্যেও গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ রাখা হয়। দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানেও ঘটতে পারে। লাইসেন্সের বিধান মতে ডিপো থেকে ১ কিলোমিটার দূরত্বে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের শো-রুম ও গুদাম করার কথা কিন্তু তারা কেন এ বিধান মানছেন না এ প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আইন মেনে কি ব্যবসা করা যাবে? আইন রয়েছে ডিপো থেকে তেল আনতে হবে ট্রেজারি চালান জমা দিয়ে। এ ছাড়া গেট পাশ নিয়ে ডিপোর ভেতর থেকে তেলের ট্রাক বা লরি বের করতে হবে। কিন্তু মেঘনা ডিপো থেকে সারাদিন তেল এনে বিকেলে চালান জমা দেই। এটিও তো আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু ডিপো সুপার তো সে সুযোগ আমাদের দিচ্ছেন।’

মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ডিপো সুপার তার ডিপোর পাশে ৪টি গ্যাস সিলিন্ডারের দোকান ও গুদাম রয়েছে স্বীকার করে জানান, এসব দেখার দায়িত্ব মূলত সিলেটের সিনিয়র সেলস অফিসারের।

তবে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের সিনিয়র সেলস অফিসার বলেন, ‘ডিপোর নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব ডিপো সুপারের। তিনি কোথাও নিরাপত্তার অভাব বোধ করলে আমাকে জানাতে পারেন। সে হিসেবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

পদ্মা অয়েল কোম্পানী লিমিটেডের শ্রীমঙ্গলের ডিপো সুপার ও যমুনা অয়েল কোম্পাণী লিমিটেডের ডিপো সুপার জানান, এলপি গ্যাস সিলিন্ডার গুদামজাত করে মজুদ রাখার ব্যাপারে যে আইন ও বিধিমালা রয়েছে তা ডিলাররা মানছেন না। বিভিন্ন সময়ে তাদের অনুরোধ করা সত্ত্বেও তারা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছেন না।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ এ জ্বালানির যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা না রেখেই শ্রীমঙ্গল শহরের ভানুগাছ রোডস্থ শাপলা এন্টাপ্রাইজ, পদ্মা অয়েল কোম্পানী ডিলার মেসার্স রাহি এন্টারপ্রাইজ, শাহাজালাল সোলার ও ব্যাটারি হাউস এন্ড এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স কৃষ্ণচুরা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স হানিফ ব্রাদার্স, সখিনা ট্রের্ডাস, মেসার্স ন্যাশনাল গ্যাস ট্রেনিং, টি এন্ড টি এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স মুন্সি এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স জাহের ট্রের্ডাস, মেসার্স হরিপুর অয়েল, মেসার্স রনি এন্টারপ্রাইজ, জেএস এন্টারপ্রাইজ মৌলভীবাজার রোডস্থ এহসান মার্কেটের হেলাল স্টোর ছাড়াও ভানুগাছ সড়কে শ্রীমঙ্গল মুক্তিযোদ্ধা কৃষি ও নার্সারি প্রকল্প মার্কেটের ভেতরে বড় গোডাউনে সিলিন্ডার স্তূপ করে রেখে খুচরা এলপি গ্যাস ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বিক্রেতারা।

এলপি গ্যাস প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর ডিলাররা বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সনদ নিলেও খুচরা ব্যবসায়ীরা সিলিন্ডার মজুদে আইন অনুসরণ করছেন না। বিস্ফোরক আইন ১৮৮৪-এর ‘দ্য এলপি গ্যাস রুলস ২০০৪-এর ৬৯ ধারার ২ বিধিতে ‘লাইসেন্স ব্যতীত কোনো ক্ষেত্রে এলপিজি মজুদ করা যাবে’ তা উল্লেখ আছে।

বিধি অনুযায়ী, ‘১০ (দশটি) গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার মজুদকরণে লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই’। অর্থাৎ ১০টির বেশি গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার মজুদের ক্ষেত্রে লাইসেন্স নিতে হবে। একই বিধির ৭১ নং ধারায় বলা আছে, আগুন নিভানোর জন্য স্থাপনা বা মজুদাগারে যথেষ্ট পরিমাণে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জাম মজুদ রাখিতে হইবে’। অথচ বিক্রেতারা ব্যবসা পরিচালনার সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করলেও ১০টির বেশি সিলিন্ডারে আবশ্যকীয় সনদ কিংবা আগুন নিভানোর জন্য স্থাপনা বা মজুদাগারে যথেষ্ট পরিমাণে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জাম মজুদ তাদের নেই।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ