আজ মঙ্গলবার, ৭ই এপ্রিল, ২০২০ ইং

বিএনপির সুজাত, আ.লীগের কে?

  • আপডেট টাইম : July 24, 2017 6:00 AM

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। কে কোন দলের প্রার্থী হবেন তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলের নেতারা কেন্দ্রীয়ভাবে এখন থেকেই লবিং-তদবির শুরু করেছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা ঈদ ও পূজা উপলক্ষ্যে পত্রপত্রিকায় এবং শুভেচ্ছা কার্ড ছাপিয়ে জনসাধারণের মধ্যে প্রচারণা শুরু করেছেন।

হবিগঞ্জ ১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের শরিক দলগুলো তাদের নেতা-কর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় ও সভাসমাবেশ শুরু করেছে। দুই জোটের প্রধান তিনটি দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণা লক্ষণীয়।
জাতীয় সংসদের হবিগঞ্জ-১ আসন বরাবরই বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দখলে।

১৯৭০ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আব্দুল আজিজ চৌধুরী, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আব্দুল মান্নান চৌধুরী ছানু মিয়া, ১৯৭৯ সালে নির্বাচিত হন জাসদ প্রার্থী মাহবুবুর রব সাদী, ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইসমত আহমদ চৌধুরী, ১৯৮৮ সালে জাসদের অ্যাডভোকেট আব্দুল মোছাব্বির চৌধুরী, ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাপা প্রার্থী প্রয়াত খলিলুর রহমান চৌধুরী রফি, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত দেওয়ান ফরিদ গাজী, ২০০১ সালে পুনরায় দেওয়ান ফরিদ গাজী, ২০০৮ সালের নির্বাচনে তৃতীয় বারের মতো প্রয়াত দেওয়ান ফরিদ গাজী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১০ সালের ১৯ নভেম্বর দেওয়ান ফরিদ গাজী মৃত্যুবরণ করেন।

২০১১ সালের ২৭ জানুয়ারী ঐ আসনে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের দুর্গে প্রথম হানা দিয়ে বিএনপি প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ সুজাত মিয়া বিজয়ী নির্বাচিত হন। উপনির্বাচনে বিএনপির এই আসনের বিজয় নিয়ে তখন সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও বিএমএর সভাপতি ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী মাত্র ১২শ ভোটে পরাজিত হন।

বিগত চারটি সংসদ নির্বাচনে ধারাবাহিক আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হলেও উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী পরাজিত হওয়ায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা হতবাক হন। পরে ২০১৪ সালে মহাজোট গঠন হলে এ আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয়া হয়। এর পর ২০১৪ সালে জাতীয় দশম সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম এ মুনিম চৌধুরী বাবু।

একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ থেকে একাধিক প্রার্থীর নাম আলোচনায় এসেছে। যদি একাদশ সংসদ নির্বাচন জোটগত হয়, তাহলে হিসাবনিকাশ পাল্টে যেতে পারে। তবে দলীয়ভাবে একক নির্বাচন হলে কয়েকজনের নাম শোনা যাচ্ছে।

প্রয়াত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর তনয় দেওয়ান শাহনেয়াজ গাজী মিলাদ, বর্তমান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএম এর সভাপতি ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী, নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আলমগীর চৌধুরী, কানাডা প্রবাসী মেজর (অব.) সুরঞ্জন দাশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। এছাড়াও আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত শাহ এএমএস কিবরিয়ার তনয় ড. রেজা কিবরিয়ার নাম।

নবীগঞ্জ ও বাহুবল আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল রয়েছে। দুটি উপজেলায় কয়েকটি ধারায় বিভক্ত আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে একটি ধারার নেতৃত্বে দিচ্ছেন বর্তমান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএমএর সভাপতি ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী, আরেক গ্রুপে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রয়াত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর তনয় দেওয়ান শাহনেয়াজ গাজী মিলাদ। অপর এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী এবং নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আলমগীর চৌধুরীর আলাদা আরেকটি বলয় রয়েছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির থেকে এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র শিকাগো বিএনপির সভাপতি শাহ মোজাম্মেল নান্টু এই আসনে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে লড়তে চান বলে শোনা যাচ্ছে। নবীগঞ্জে উপজেলা বিএনপি এখন দ্বিখন্ডিত। গত বছরের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নবীগঞ্জ উপজেলায় ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র শিকাগো বিএনপির সভাপতি শাহ মোজাম্মেল নান্টু সমর্থিত ৪জন বিএনপি নেতা চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পান। এ নিয়ে দলীয় কোন্দল চরম আকার ধারণ করে। এই কোন্দলের কারণে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির চরম ভরাডুবি হয় বলে মনে করছেন জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। অপরদিকে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসাবে বিএনপির শেখ সুজাত মিয়ার নাম শোনা যাচ্ছে।

বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এ আসনের ২০টি ইউনিয়নের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১২জন, বিএনপির ৩জন, জাপার ১ জন এবং স্বতন্ত্র ৪ জন চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দুটি উপজেলায় আওয়ামীলীগ প্রার্থী বিজয়ী হন। নবীগঞ্জে বিজয়ী হন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আলমগীর চৌধুরী, বাহুবলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাই নির্বাচিত হন।

ভাইস চেয়ারম্যান পদে নবীগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আশরাফ আলী ও বাহুবলে ইসলামী ঐক্যজোট নেতা শিহাব উদ্দিন শাকিব বিজয়ী হন। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিএনপির প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। এরা হচ্ছেন বাহুবলে নাদিরা খানম ও নবীগঞ্জে নাজমা বেগম।

নবীগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী ছাবির আহমদ চৌধুরী বিজয়ী হন। এদিকে জাতীয় পাটি থেকে একক প্রার্থী হিসাবে বর্তমান এমপি ও কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক এম এ মুনিম চৌধুরী বাবু প্রচারণা চালাচ্ছেন। লন্ডন প্রবাসী জাপা নেতা আব্দুল হামিদ চৌধুরীও প্রবাসে থেকে ব্যানার ফেস্টুনের মাধ্যমে প্রচারণা করে যাচ্ছেন। তিনি আগামী সংসদ নির্বাচনে জাপা প্রার্থী হতে চান।

বিভিন্ন দিবসকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির সমর্থকরা তাদের নেতাকে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে এমপি হিসেবে দেখতে চান বলে বিভিন্ন হাটবাজারে ব্যানার, ফেস্টুনে টাঙিয়ে থাকেন।

এব্যাপারে বর্তমান সংসদ সদস্য এম.এ মুনিম চৌধুরী বাবুর সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি বলেন বিগত ২১ বছরে যে উন্নয়ন হয়নি তার চেয়ে বেশি উন্নয়ন করেছি। যে সব রাস্তার কথা বলা হয়েছে সে ব্যাপারে তিনি ডিও লেটার প্রদান করেছেন বলে জানান। অচিরেই ফরিদপুরের ভাঙা সড়ক মেরামত হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে তিনি মহাজোট হলে তিনি জোটের প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করবেন। জাপার দলীয় একক প্রার্থী হিসাবে তিনি প্রচারণা করছেন বলে জানান।

এদিকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএমএর সভাপতি এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী বলেন, ২০১১ সালের ২৭ জানুয়ারি উপনির্বাচনে দলীয় কিছু বিশ্বাসঘাতকদের কারণে সামান্য ভোটে পরাজয় হয়েছিল। তিনি আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন মনোনয়ন পেলে নির্বাচন করবেন। তিনি আরো বলেন, আমি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হিসাবে নবীগঞ্জ-বাহুবলের ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। আগামীতে আমাকে জনসাধারণ মূল্যায়ন করবেন।

সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর তনয় দেওয়ান শাহনেওয়াজ গাজী মিলাদ বলেন, আমার বাবা এ আসনের চার বারের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি এলাকার জনস্বার্থে কাজ করেছেন। আমি তাঁর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে চাই। জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার বাবার অবদান তুলে ধরেছি। তিনি বিগত নির্বাচনে আমাকে দলীয় টিকিট দিয়েছিলেন। কিন্তু মহাজোটের কারণে আমি মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিই।

নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আলমগীর চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে কাজ করছি। তৃণমূল নেতাদের যদি দল মূল্যায়ন করা হয়, তা হলে নেত্রী আমাকে দলীয় মনোনয়ন দেবেন বলে বিশ্বাস করি।

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী বলেন, আমি দলীয় মনোনয়ন চাইব। দলীয় মনোনয়ন পেলে সরাসরি নির্বাচন করব। আমি এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করছি। আমাদের সরকারের আমলে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তাই জনগণ আগামীতে নৌকায় ভোট দিতে ভুল করবেন না।

এদিকে বিএনপির একক প্রার্থী হিসাবে প্রচারণায় থাকা সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে এলাকার মধ্যে কোনো উন্নয়ন হয়নি। যা হয়েছে সব লুটপাট আর নিজের উন্নয়ন। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হলে জনগণ বর্তমান সরকারের প্রার্থীদের ভোটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করবেন। আগামী নির্বাচনে যদি আমার দল অংশগ্রহণ করে, তাহলে আমি দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেব। বিগত সময়ে উপনির্বাচনে জনগণ আমাকে বিজয়ী করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকারের একচোখা নীতির কারণে আশানুরূপ কোনো উন্নয়ন করতে পারিনি।

 

(আজকের সিলেট/২৪ জুলাই/ডি/কেআর/ঘ.)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ