আজ শনিবার, ১৪ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

আশা-নিরাশার দোলাচলে হাওর পাড়ের কৃষকরা

  • আপডেট টাইম : April 12, 2018 6:01 AM

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : ‘ভাই, গত ৪ দিন তনি আকতা (হঠাৎ) আশমান (আকাশ) কালা করি যে মেঘ-তুফান আর হিল (শিলাবুষ্টি) দের। এবারও ধান তুলতাম পারমু করি মনে অর না। আর বুড়িকিয়ারি বান (বাঁধ) না কাঠার কারণে একটু মেঘ দিলেই উজানর পানি আইয়া হাওর ভরি যায়। ডুবি যায় আমরার কষ্টর বরুয়া ধান। গত তিন বছর তনে বরুয়া ধান ঘর তুলতাম পারছি না। এবারও যদি ধান তুলতাম না পারি তাইলে খাইয়া বাছমু কিলা চিন্তা কররাম।’

এভাবে কথাগুলো বলছিলেন হাকালুকি হাওরপাড়ের ভুকশিমইল ইউনিয়নের কৃষক মাসুক মিয়া।

এ শঙ্কা শুধু মাসুক মিয়ার নয়। পুরো হাওর পাড়ের লক্ষাধিক মানুষের মনে বিরাজ করছে। গত বছরের অকাল বন্যায় তলিয়ে গেছে হাওর পাড়ের কৃষকদের শতভাগ বোরো ধান। অর্থনৈতিক দৈন্যদশার পাশাপাশি সীমাহীন খাদ্য সংকটে পড়া কৃষকরা এবার বোরো চাষ করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু ঘন ঘন বৃষ্টি তাদের মনে শংকা বাড়িয়ে দিয়েছে। হাকালুকি হাওর ছাড়াও জেলার অন্য হাওর পাড়ের কৃষকদের মাঝেও এ উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

হাকালুকি হাওর তীর ঘুরে দেখা যায়, গত কয়েক বছরের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে এ বছর জেলার হাওরপাড়সহ অন্যান্য অঞ্চলের কৃষকরা বুকভার স্বপ্ন নিয়ে চাষ করছেন বোরো ধান। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফসল হারানোর ক্ষতটা সেরে উঠার চেষ্টা করেছিলেন। ইতোমধ্যে ব্রি-২৮ জাতের বোরো ধান পাকায় ১ এপ্রিল থেকে ধান কাটাও শুরু হয়েছে।

কিন্তু ধানে চিটা আর গণহারে ব্লাস্ট আর নেক ব্লাট রোগ দেখা দেয়ায় স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে কৃষকদের। বেশিরভাগ ধানের শিষের গোড়ায় কালচে দাগ পড়েছে। এসব ধানের ভেতর চাল নেই। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে ধান কাটা চলছে। কাটা ধান মাড়াই কাজও শুরু হয়েছে।

জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলায় এ বছর ৫৪ হাজার ১২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ১৯ হাজার ৩৬৬ হেক্টর। বাকিটুকু চাষ হয়েছে হাওরপাড়সহ অপেক্ষাকৃত উচু অঞ্চলে। হাওরাঞ্চলের মধ্যে এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া উপজেলা অংশে ৪ হাজার ৫৮০ হেক্টর, জুড়ী উপজেলায় ৪ হাজার ৯০০ হেক্টর, বড়লেখা উপজেলায় ২ হাজার ৪৭৫ হেক্টর, রাজনগর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরে ৩ হাজার ৩৭৩ হেক্টর, কমলগঞ্জ উপজেলার কেউলার হাওরে ৪০০ হেক্টর, শ্রীমঙ্গল উপজেলার হাইল হাওরের ৩ হাজার ৬৩৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে।

কৃষি অফিস সূত্র আরো জানায়, গত মৌসুমে দফায় দফায় বন্যায় জেলার ১১ হাজার ৬২১ হেক্টরের বোরো ও আউশ ধানের ক্ষতি হয়েছিল। এর মধ্যে বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ৯ হাজার ৯১৪ হেক্টর ও আউশ ১ হাজার ৭০৭ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্থ জমি থেকে চাল উৎপাদন হতো ৩৩ হাজার ৯০৭ মেট্রিক টন। ৩৪ টাকা কেজি দরে এই চালের মূল্য ১১৫ কোটি ২৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা।

হাকালুকি হাওর পাড়ের ভুকশিমইল গ্রামের বাসিন্দা শেখ জেবুল মিয়া, জিয়াউর রহমান মিন্টু, নজরুল ইসলাম জানান, গত বছর অকাল বন্যায় তলিয়ে যায় হাওরের বোরো ক্ষেত। আমরা একটি ধানও ঘরে তুলতে পারি নাই। এরপর দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কারণে আমরা কোনো ক্ষেত করতে পারি নাই।

তারা বলেন, এ বছরও বোরো চাষ করে চেষ্টা করেছিলাম ঘুরে দাঁড়াতে। কিন্তু ধানে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়ায় আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে। আর গত ক’দিন থেকে কয়েক দফা বৃষ্টি আমাদের মনে ধান হারানোর শঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে। এবার যদি বোরো ধান ঘরে তুলতে না পারি তাহলে আমাদের পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।

হাওর বাঁচাও কৃষক বাচাঁও সংগ্রাম পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাজী মোঃ আলাউদ্দিন জানান, শুকনো মৌসুমে হাকালুকি হাওরের দুঃখখ্যাত বুড়িকিয়ারী বাঁধ ও হাওরের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত সকল নদী খনন না করায় একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর মৌলভীবাজারের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, নেকব্লাস্ট রোগ ও কোল্ড ইনজুরির কারনে ধানে চিটা দেখা দিতে পারে। রাতের তাপমাত্রা কমে গেলে কোল্ড ইনজুরি দেখা দেয়। আর এমনতিইে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ধানে চিটা থাকে। দু-একদিনের মধ্যে সরেজমিনে বিষয়টির খোঁজ নেব।

(আজকের সিলেট/১২ এপ্রিল/ডি/এসসি/ঘ.)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ